ঢাকা ১২:৫৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
পুরান ঢাকায় এক পঙ্গু হতদরিদ্র ব্যক্তিকে হুইলচেয়ার উপহার দিলো ছাত্রদল নেতারা  হযরতপুরে চাচা হাজী দুঃখ মিয়া বিরুদ্ধে জাল দলিল ও জমি দখলের অভিযোগ তুলেছে ভাতিজা আলা. পুরান ঢাকার সফল সংগঠক মোস্তাকের জন্মদিন পালিত কেরানীগঞ্জে ডিবি পুলিশের অভিযানে ৫০ পিস ইয়াবাসহ একজন গ্রেপ্তার জেলা প্রশাসকের সঙ্গে অতুল বসাকের মতবিনিময়, রামরাই বিনোদন পার্কের প্রাচীর নির্মাণ নিয়ে আলোচনা সাংবাদিক মুন্না মিয়ার মৃত্যুতে ডিএসইসির শোক কেরানীগঞ্জে ডিবির বিশেষ অভিযান: ইয়াবা ও হেরোইনসহ দুই মাদক কারবারি গ্রেপ্তার, প্রতারণা মামলায় আরও দুইজন আটক। কেরানীগঞ্জে ডিবির অভিযানে ছাত্রলীগের সহসভাপতি গ্রেপ্তার সিনিয়র ক্রাইম রিপোর্টার মোঃ শাহাদাৎ হোসেন চাঁপাইনবাবগঞ্জে ১ কেজি গাঁজাসহ নারীসহ গ্রেপ্তার ২ মালয়েশিয়ায় পাঠানোর প্রলোভনে দুই কিশোরকে মিয়ানমারে পাচারের অভিযোগ

কোটা আন্দোলন থেকে সরকার পতন: ইতিহাস বদলে দেওয়া জুলাই বিপ্লবের সূচনার দিন আজ

অনলাইন ডেস্ক
  • আপডেট সময় : ১০:২১:১৬ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১ জুলাই ২০২৬
  • / 80
আজকের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

নিজস্ব প্রতিবেদক

আজ ১ জুলাই। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক যুগান্তকারী অধ্যায়ের সূচনার দিন। ঠিক দুই বছর আগে, ২০২৪ সালের এই দিনে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হয়েছিল শিক্ষার্থীদের আন্দোলন। পরবর্তীতে সেই আন্দোলন ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয় এবং ৫ আগস্ট তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের মধ্য দিয়ে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার জন্ম দেয়। ইতিহাসে এটি এখন ‘জুলাই বিপ্লব’ নামে পরিচিত।

আন্দোলনের সূচনা

২০২৪ সালের ৫ জুন হাইকোর্ট ২০১৮ সালে জারি করা কোটা বাতিলের সরকারি পরিপত্র অবৈধ ঘোষণা করলে মুক্তিযোদ্ধা কোটাসহ মোট ৫৬ শতাংশ কোটা পুনর্বহাল হয়। এই সিদ্ধান্তে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে।

এর প্রতিবাদে শিক্ষার্থীরা কোটা বাতিলের নির্বাহী আদেশ জারির দাবি জানান। ৯ জুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সরকারকে ৩০ জুন পর্যন্ত সময় বেঁধে দেন। দাবি বাস্তবায়ন না হলে সর্বাত্মক আন্দোলনের ঘোষণা দেওয়া হয়।

অবশেষে ১ জুলাই ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ ব্যানারে দেশব্যাপী কর্মসূচি শুরু হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, Bangladesh Agricultural University-সহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিক্ষোভ, মানববন্ধন ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।

শান্তিপূর্ণ আন্দোলন থেকে উত্তাল রাজপথ

প্রথমদিকে আন্দোলন ছিল শান্তিপূর্ণ। শিক্ষার্থীরা ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন, গণপদযাত্রা, অবস্থান কর্মসূচি ও সড়ক অবরোধের মতো কর্মসূচি পালন করেন।

৬ জুলাই ‘বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। ৭ জুলাই দেশজুড়ে শিক্ষার্থীরা গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও মোড়ে অবস্থান নিয়ে অবরোধ গড়ে তোলেন। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় যান চলাচল ব্যাহত হয়।

১০ জুলাই সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ হাইকোর্টের রায়ের ওপর চার সপ্তাহের স্থিতাবস্থা জারি করে। কিন্তু তাতে আন্দোলন থামেনি। বরং ১১ ও ১২ জুলাই শাহবাগসহ বিভিন্ন এলাকায় পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

১৪ জুলাই: মোড় ঘোরার দিন

১৪ জুলাই আন্দোলনের মোড় ঘুরে যায়। সেদিন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি মন্তব্য শিক্ষার্থীদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।

এরপর মধ্যরাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। ‘চেয়েছিলাম অধিকার, হয়ে গেলাম রাজাকার’—এই স্লোগান দ্রুত আন্দোলনের প্রতীকে পরিণত হয়।

সহিংসতার বিস্তার

১৫ জুলাই আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগের হামলার অভিযোগ ওঠে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সংঘর্ষ, হামলা, পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও ককটেল বিস্ফোরণে শতাধিক শিক্ষার্থী আহত হন।

পরদিন ১৬ জুলাই পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নেয়। দেশজুড়ে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। Abu Sayeed-এর নিহত হওয়ার ঘটনা আন্দোলনকে নতুন মাত্রা দেয়।

এরপর ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় Border Guard Bangladesh মোতায়েন করা হয়। বন্ধ ঘোষণা করা হয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এইচএসসি পরীক্ষাও স্থগিত করা হয়।

আন্দোলন থেকে গণঅভ্যুত্থান

সরকার আন্দোলন নিয়ন্ত্রণে কারফিউ, সেনা মোতায়েন, ইন্টারনেট বন্ধসহ নানা পদক্ষেপ নেয়। কিন্তু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসেনি।

বরং আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বলপ্রয়োগ ও দমন-পীড়নে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। কোটা সংস্কারের দাবি ধীরে ধীরে সরকারবিরোধী বৃহত্তর আন্দোলনে রূপ নেয়।

শিক্ষার্থী, সাধারণ মানুষ, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ আন্দোলনে যুক্ত হতে থাকেন। আন্দোলন আর শুধু কোটার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; এটি রাষ্ট্রীয় জবাবদিহি, নাগরিক অধিকার ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের দাবিতে রূপ নেয়।

পতন ও নতুন ইতিহাস

টানা ৩৬ দিনের আন্দোলনের পর ৫ আগস্ট ঘটে ঐতিহাসিক পরিবর্তন। শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়।

জুলাইয়ের সেই আন্দোলন আজ শুধু একটি ছাত্র আন্দোলনের স্মৃতি নয়; এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বড় এক মোড় পরিবর্তনের প্রতীক।

প্রতি বছরের ১ জুলাই তাই এখন শুধু একটি তারিখ নয়—এটি এক আন্দোলনের সূচনা, প্রতিরোধের প্রতীক এবং ইতিহাস বদলে দেওয়া এক বিপ্লবের স্মারক।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

কোটা আন্দোলন থেকে সরকার পতন: ইতিহাস বদলে দেওয়া জুলাই বিপ্লবের সূচনার দিন আজ

আপডেট সময় : ১০:২১:১৬ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১ জুলাই ২০২৬

নিজস্ব প্রতিবেদক

আজ ১ জুলাই। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক যুগান্তকারী অধ্যায়ের সূচনার দিন। ঠিক দুই বছর আগে, ২০২৪ সালের এই দিনে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হয়েছিল শিক্ষার্থীদের আন্দোলন। পরবর্তীতে সেই আন্দোলন ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয় এবং ৫ আগস্ট তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের মধ্য দিয়ে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার জন্ম দেয়। ইতিহাসে এটি এখন ‘জুলাই বিপ্লব’ নামে পরিচিত।

আন্দোলনের সূচনা

২০২৪ সালের ৫ জুন হাইকোর্ট ২০১৮ সালে জারি করা কোটা বাতিলের সরকারি পরিপত্র অবৈধ ঘোষণা করলে মুক্তিযোদ্ধা কোটাসহ মোট ৫৬ শতাংশ কোটা পুনর্বহাল হয়। এই সিদ্ধান্তে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে।

এর প্রতিবাদে শিক্ষার্থীরা কোটা বাতিলের নির্বাহী আদেশ জারির দাবি জানান। ৯ জুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সরকারকে ৩০ জুন পর্যন্ত সময় বেঁধে দেন। দাবি বাস্তবায়ন না হলে সর্বাত্মক আন্দোলনের ঘোষণা দেওয়া হয়।

অবশেষে ১ জুলাই ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ ব্যানারে দেশব্যাপী কর্মসূচি শুরু হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, Bangladesh Agricultural University-সহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিক্ষোভ, মানববন্ধন ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।

শান্তিপূর্ণ আন্দোলন থেকে উত্তাল রাজপথ

প্রথমদিকে আন্দোলন ছিল শান্তিপূর্ণ। শিক্ষার্থীরা ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন, গণপদযাত্রা, অবস্থান কর্মসূচি ও সড়ক অবরোধের মতো কর্মসূচি পালন করেন।

৬ জুলাই ‘বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। ৭ জুলাই দেশজুড়ে শিক্ষার্থীরা গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও মোড়ে অবস্থান নিয়ে অবরোধ গড়ে তোলেন। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় যান চলাচল ব্যাহত হয়।

১০ জুলাই সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ হাইকোর্টের রায়ের ওপর চার সপ্তাহের স্থিতাবস্থা জারি করে। কিন্তু তাতে আন্দোলন থামেনি। বরং ১১ ও ১২ জুলাই শাহবাগসহ বিভিন্ন এলাকায় পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

১৪ জুলাই: মোড় ঘোরার দিন

১৪ জুলাই আন্দোলনের মোড় ঘুরে যায়। সেদিন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি মন্তব্য শিক্ষার্থীদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।

এরপর মধ্যরাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। ‘চেয়েছিলাম অধিকার, হয়ে গেলাম রাজাকার’—এই স্লোগান দ্রুত আন্দোলনের প্রতীকে পরিণত হয়।

সহিংসতার বিস্তার

১৫ জুলাই আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগের হামলার অভিযোগ ওঠে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সংঘর্ষ, হামলা, পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও ককটেল বিস্ফোরণে শতাধিক শিক্ষার্থী আহত হন।

পরদিন ১৬ জুলাই পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নেয়। দেশজুড়ে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। Abu Sayeed-এর নিহত হওয়ার ঘটনা আন্দোলনকে নতুন মাত্রা দেয়।

এরপর ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় Border Guard Bangladesh মোতায়েন করা হয়। বন্ধ ঘোষণা করা হয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এইচএসসি পরীক্ষাও স্থগিত করা হয়।

আন্দোলন থেকে গণঅভ্যুত্থান

সরকার আন্দোলন নিয়ন্ত্রণে কারফিউ, সেনা মোতায়েন, ইন্টারনেট বন্ধসহ নানা পদক্ষেপ নেয়। কিন্তু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসেনি।

বরং আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বলপ্রয়োগ ও দমন-পীড়নে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। কোটা সংস্কারের দাবি ধীরে ধীরে সরকারবিরোধী বৃহত্তর আন্দোলনে রূপ নেয়।

শিক্ষার্থী, সাধারণ মানুষ, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ আন্দোলনে যুক্ত হতে থাকেন। আন্দোলন আর শুধু কোটার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; এটি রাষ্ট্রীয় জবাবদিহি, নাগরিক অধিকার ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের দাবিতে রূপ নেয়।

পতন ও নতুন ইতিহাস

টানা ৩৬ দিনের আন্দোলনের পর ৫ আগস্ট ঘটে ঐতিহাসিক পরিবর্তন। শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়।

জুলাইয়ের সেই আন্দোলন আজ শুধু একটি ছাত্র আন্দোলনের স্মৃতি নয়; এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বড় এক মোড় পরিবর্তনের প্রতীক।

প্রতি বছরের ১ জুলাই তাই এখন শুধু একটি তারিখ নয়—এটি এক আন্দোলনের সূচনা, প্রতিরোধের প্রতীক এবং ইতিহাস বদলে দেওয়া এক বিপ্লবের স্মারক।