ঢাকা ০৪:২০ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
আইইডিসিআর-এর পরিচালককে নিজ কার্যালয়ে মারধরের অভিযোগ আট বিভাগে বৃষ্টির আভাস, কমবে তাপমাত্রা এসআরবি-১৪, সিপিএসসি, ময়মনসিংহ এর পৃথক অভিযানে হত্যা ও অপহরণ মামলার ০২ আসামি গ্রেফতার। পুরান ঢাকায় এক পঙ্গু হতদরিদ্র ব্যক্তিকে হুইলচেয়ার উপহার দিলো ছাত্রদল নেতারা  হযরতপুরে চাচা হাজী দুঃখ মিয়া বিরুদ্ধে জাল দলিল ও জমি দখলের অভিযোগ তুলেছে ভাতিজা আলা. পুরান ঢাকার সফল সংগঠক মোস্তাকের জন্মদিন পালিত কেরানীগঞ্জে ডিবি পুলিশের অভিযানে ৫০ পিস ইয়াবাসহ একজন গ্রেপ্তার জেলা প্রশাসকের সঙ্গে অতুল বসাকের মতবিনিময়, রামরাই বিনোদন পার্কের প্রাচীর নির্মাণ নিয়ে আলোচনা সাংবাদিক মুন্না মিয়ার মৃত্যুতে ডিএসইসির শোক কেরানীগঞ্জে ডিবির বিশেষ অভিযান: ইয়াবা ও হেরোইনসহ দুই মাদক কারবারি গ্রেপ্তার, প্রতারণা মামলায় আরও দুইজন আটক।

‘আমার ভাইরে যারা পুড়াইয়া মারছে, তাদের বিচার চাই’ — ফুলবাড়িয়ায় নিহত বাসচালকের পরিবারের আহাজারি

অনলাইন ডেস্ক
  • আপডেট সময় : ১১:১০:৫৪ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১২ নভেম্বর ২০২৫
  • / 192
আজকের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

“আমার ভাইরে যারা আগুনে পুড়াইয়া মারছে, ওই খুনিদের বিচার চাই। আমার ভাই আর নাই, কী কারণে আমার ভাইরে পুড়াইছে, আমি জানতে চাই।” — মঙ্গলবার (১১ নভেম্বর) বিকেলে ফুলবাড়িয়া উপজেলার কৈয়ারচালা গ্রামে নিহত বাসচালক জুলহাস মিয়ার বাড়ির উঠানে কান্নাজড়িত কণ্ঠে এমন আহাজারি করেন তার বোন মোছা. ময়না আক্তার।

সেদিন বিকেলে পুরো বাড়িজুড়ে আহাজারিতে শোকের ছায়া নেমে আসে। স্বজন ও প্রতিবেশীরাও অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়েন জুলহাসের মৃত্যুর বর্ণনা শুনে।

গত সোমবার (১০ নভেম্বর) দিবাগত রাতে উপজেলার ভালুকজান এলাকার একটি পেট্রোল পাম্পের সামনে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের তিন দুর্বৃত্ত মাস্ক পরে আলম এশিয়া পরিবহনের একটি বাসে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে পালিয়ে যায়। এ সময় বাসের ভেতরে ঘুমিয়ে থাকা চালক জুলহাস মিয়া পুড়ে অঙ্গার হয়ে যান। তিনি স্থানীয় কৈয়ারচালা গ্রামের বাসিন্দা মো. সাজু মিয়ার ছেলে।

চোখের পানি মুছে জুলহাসের মা সাজেদা বেগম বলেন,
“আমার ছেলে বাস চালায়, তারে আগুনে পুড়াইয়া মারছে। সপ্তাহে একদিন বাড়িতে আসত। তার অনেক ঋণ ছিল, কিস্তি দিতে হতো। তবুও হাসিমুখে সংসার চালাত। আমি মানুষের বাড়িতে কাজ করতাম, সে বলত ‘মা, তুমি আর কাজ করো না, আমি আছি’। আজ আমার ছেলে নাই। আমি খুনিদের বিচার চাই।”

মাত্র এক বছর আগে জুলহাস বিয়ে করেছিলেন জাকিয়া আক্তারকে। শোকে বাকরুদ্ধ জাকিয়া বলেন,
“এক বছর হলো সংসার শুরু করেছি। এখন আমি কাকে নিয়ে বাঁচব? যারা আমার স্বামীরে মারছে, আমি তাদের ফাঁসি চাই।”

স্থানীয়রা জানান, পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী ছিলেন জুলহাস মিয়া। ঋণের টাকায় ঘর তুলে মায়ের কষ্ট লাঘব ও সংসারের স্বপ্ন বুনেছিলেন তিনি। কিন্তু একদল সন্ত্রাসীর আগুনে সেই সংসার, সেই স্বপ্ন পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।

কৈয়ারচালা গ্রামের বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, “আগুন সন্ত্রাসীদের এই নির্মমতায় আমরা ঘৃণা ও ক্ষোভে ফুঁসে আছি। রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় একজন পরিশ্রমী চালককে হত্যা করা হয়েছে। প্রশ্ন হলো, কেমন রাজনীতি মানুষ পুড়িয়ে মারে?”

এই ঘটনায় মারাত্মকভাবে দগ্ধ হয়েছেন যাত্রী শাহিদ ইসলাম বাদশা (২০) এবং তার মা মোছা. শারমিন সুলতানা রুমকি (৪৫)। তারা ঢাকা থেকে বাড়ি ফেরার পথে রাত বেশি হয়ে যাওয়ায় বাসেই অবস্থান করছিলেন। হঠাৎ আগুন লাগলে বাসের কাচ ভেঙে তারা নিচে নেমে প্রাণে বাঁচেন।

ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে ময়মনসিংহের পুলিশ সুপার কাজী আখতার উল আলম জানান,
“সিসি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরাই নাশকতার উদ্দেশ্যে এ আগুন দেয়। ঘটনায় জড়িতদের শনাক্তের কাজ চলছে, দ্রুত গ্রেপ্তার সম্ভব হবে বলে আশা করছি।”

সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, গভীর রাতে পেট্রোল পাম্পের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা বাসের সামনের অংশে তিন ব্যক্তি আগুন ধরিয়ে পালিয়ে যায়। মুহূর্তেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে এবং ঘুমন্ত অবস্থায় জুলহাস মিয়া প্রাণ হারান।

ফুলবাড়িয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. রোকনুজ্জামান বলেন,
“আলম এশিয়া পরিবহনের বাসটি রাত ২টা ৪৫ মিনিটে ফুলবাড়িয়ায় পৌঁছায়। চালক জুলহাস বিশ্রাম নিচ্ছিলেন, ঠিক তখনই দুর্বৃত্তরা এসে আগুন ধরিয়ে পালিয়ে যায়। ঘটনাটি একটি পরিকল্পিত অগ্নিসংযোগ।”

প্রসঙ্গত, আগামী ১৩ নভেম্বর সারাদেশে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের লকডাউন কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে এমন নাশকতামূলক ঘটনায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে ফুলবাড়িয়া উপজেলায়।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

‘আমার ভাইরে যারা পুড়াইয়া মারছে, তাদের বিচার চাই’ — ফুলবাড়িয়ায় নিহত বাসচালকের পরিবারের আহাজারি

আপডেট সময় : ১১:১০:৫৪ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১২ নভেম্বর ২০২৫

“আমার ভাইরে যারা আগুনে পুড়াইয়া মারছে, ওই খুনিদের বিচার চাই। আমার ভাই আর নাই, কী কারণে আমার ভাইরে পুড়াইছে, আমি জানতে চাই।” — মঙ্গলবার (১১ নভেম্বর) বিকেলে ফুলবাড়িয়া উপজেলার কৈয়ারচালা গ্রামে নিহত বাসচালক জুলহাস মিয়ার বাড়ির উঠানে কান্নাজড়িত কণ্ঠে এমন আহাজারি করেন তার বোন মোছা. ময়না আক্তার।

সেদিন বিকেলে পুরো বাড়িজুড়ে আহাজারিতে শোকের ছায়া নেমে আসে। স্বজন ও প্রতিবেশীরাও অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়েন জুলহাসের মৃত্যুর বর্ণনা শুনে।

গত সোমবার (১০ নভেম্বর) দিবাগত রাতে উপজেলার ভালুকজান এলাকার একটি পেট্রোল পাম্পের সামনে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের তিন দুর্বৃত্ত মাস্ক পরে আলম এশিয়া পরিবহনের একটি বাসে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে পালিয়ে যায়। এ সময় বাসের ভেতরে ঘুমিয়ে থাকা চালক জুলহাস মিয়া পুড়ে অঙ্গার হয়ে যান। তিনি স্থানীয় কৈয়ারচালা গ্রামের বাসিন্দা মো. সাজু মিয়ার ছেলে।

চোখের পানি মুছে জুলহাসের মা সাজেদা বেগম বলেন,
“আমার ছেলে বাস চালায়, তারে আগুনে পুড়াইয়া মারছে। সপ্তাহে একদিন বাড়িতে আসত। তার অনেক ঋণ ছিল, কিস্তি দিতে হতো। তবুও হাসিমুখে সংসার চালাত। আমি মানুষের বাড়িতে কাজ করতাম, সে বলত ‘মা, তুমি আর কাজ করো না, আমি আছি’। আজ আমার ছেলে নাই। আমি খুনিদের বিচার চাই।”

মাত্র এক বছর আগে জুলহাস বিয়ে করেছিলেন জাকিয়া আক্তারকে। শোকে বাকরুদ্ধ জাকিয়া বলেন,
“এক বছর হলো সংসার শুরু করেছি। এখন আমি কাকে নিয়ে বাঁচব? যারা আমার স্বামীরে মারছে, আমি তাদের ফাঁসি চাই।”

স্থানীয়রা জানান, পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী ছিলেন জুলহাস মিয়া। ঋণের টাকায় ঘর তুলে মায়ের কষ্ট লাঘব ও সংসারের স্বপ্ন বুনেছিলেন তিনি। কিন্তু একদল সন্ত্রাসীর আগুনে সেই সংসার, সেই স্বপ্ন পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।

কৈয়ারচালা গ্রামের বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, “আগুন সন্ত্রাসীদের এই নির্মমতায় আমরা ঘৃণা ও ক্ষোভে ফুঁসে আছি। রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় একজন পরিশ্রমী চালককে হত্যা করা হয়েছে। প্রশ্ন হলো, কেমন রাজনীতি মানুষ পুড়িয়ে মারে?”

এই ঘটনায় মারাত্মকভাবে দগ্ধ হয়েছেন যাত্রী শাহিদ ইসলাম বাদশা (২০) এবং তার মা মোছা. শারমিন সুলতানা রুমকি (৪৫)। তারা ঢাকা থেকে বাড়ি ফেরার পথে রাত বেশি হয়ে যাওয়ায় বাসেই অবস্থান করছিলেন। হঠাৎ আগুন লাগলে বাসের কাচ ভেঙে তারা নিচে নেমে প্রাণে বাঁচেন।

ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে ময়মনসিংহের পুলিশ সুপার কাজী আখতার উল আলম জানান,
“সিসি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরাই নাশকতার উদ্দেশ্যে এ আগুন দেয়। ঘটনায় জড়িতদের শনাক্তের কাজ চলছে, দ্রুত গ্রেপ্তার সম্ভব হবে বলে আশা করছি।”

সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, গভীর রাতে পেট্রোল পাম্পের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা বাসের সামনের অংশে তিন ব্যক্তি আগুন ধরিয়ে পালিয়ে যায়। মুহূর্তেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে এবং ঘুমন্ত অবস্থায় জুলহাস মিয়া প্রাণ হারান।

ফুলবাড়িয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. রোকনুজ্জামান বলেন,
“আলম এশিয়া পরিবহনের বাসটি রাত ২টা ৪৫ মিনিটে ফুলবাড়িয়ায় পৌঁছায়। চালক জুলহাস বিশ্রাম নিচ্ছিলেন, ঠিক তখনই দুর্বৃত্তরা এসে আগুন ধরিয়ে পালিয়ে যায়। ঘটনাটি একটি পরিকল্পিত অগ্নিসংযোগ।”

প্রসঙ্গত, আগামী ১৩ নভেম্বর সারাদেশে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের লকডাউন কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে এমন নাশকতামূলক ঘটনায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে ফুলবাড়িয়া উপজেলায়।