‘নামা’ জমিকে ‘কান্দা’ দেখিয়ে সংস্কৃতিকর্মী ও তার পরিবারকে কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ কম দেওয়ার অভিযোগ!
- আপডেট সময় : ০৬:০৪:২৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ১২ জুলাই ২০২৫
- / 588
📍 ময়মনসিংহের জমি অধিগ্রহণে শ্রেণি পরিবর্তনের গোপন খেলা
ময়মনসিংহ নগরীর চর গোবিন্দপুর মৌজায় বিভাগীয় অফিস নির্মাণের জন্য জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়ায় জমির প্রকৃত শ্রেণি ‘নামা’ থাকা সত্ত্বেও চূড়ান্ত রিপোর্টে সেটিকে ‘কান্দা’ হিসেবে উল্লেখ করে প্রায় ১ কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে; এমন বিস্ফোরক অভিযোগ তুলেছেন ভুক্তভোগী পরিবার।
ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি ময়মনসিংহ সদর উপজেলার একজন সংস্কৃতিকর্মী মোঃ মাহবুব হোসেন শরিফ ও তার পরিবার। অভিযোগ অনুযায়ী, জমির শ্রেণি বদলের এই গোপন খেলায় তাঁর পরিবারের প্রাপ্য ক্ষতিপূরণ কমিয়ে ফেলা হয়েছে প্রায় ৯৮ লাখ ১৮ হাজার টাকা!
সরেজমিনে জানা যায়, সিরতা ইউনিয়নের গোবিন্দপুর মৌজায় মাহবুব হোসেন শরিফ গং-এর পৈতৃক জমির পরিমাণ ১ একর ৩১ শতাংশ। অধিগ্রহণের আওতায় পড়েছে ৪২৬৬ দাগের আনুমানিক ১০০ শতাংশ জমি। জমির দলিল, এলএ রেকর্ড, বিআরএস, ভূমি ব্যবহার সনদসহ সব নথিতে জমির শ্রেণি ‘নামা’ হিসেবেই উল্লেখ আছে।
২০২২ সালের ৭ নভেম্বরের ৪ ধারার নোটিশ, ২০২৩ সালের ৭ সেপ্টেম্বরের ৭ ধারার নোটিশ এবং ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তার এওয়ার্ড বইয়ে ; সর্বত্র জমির শ্রেণি ‘নামা’। অথচ, বিস্ময়করভাবে, ২০২৪ সালের ৫ মে জারিকৃত ৮ ধারার চূড়ান্ত নোটিশে জমির শ্রেণি হয়ে যায় ‘কান্দা’।
জেলা প্রশাসনের ভূমি অধিগ্রহণ শাখা থেকে নির্ধারিত হারে ‘নামা’ শ্রেণির জমির মূল্য ধরা হয়েছে প্রতি শতাংশে ১,৭৪,৫৪৩ টাকা, আর ‘কান্দা’ জমির মূল্য ধরা হয়েছে ৭৬,৩৬২ টাকা।
এই হিসেবে মাহবুব হোসেন গং-এর পাওয়ার কথা ছিল প্রায় ১ কোটি ৭৪ লাখ ৫৪ হাজার ৩০০ টাকা, কিন্তু চূড়ান্ত ৮ ধারার রিপোর্ট অনুযায়ী বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে শুধু ৭৬ লাখ ৩৬ হাজার ২০০ টাকা।
অর্থাৎ, একটি শব্দ বদলের মাধ্যমে প্রায় ৯৮ লাখ ১৮ হাজার টাকা কেটে নেওয়া হয়েছে একজন সংস্কৃতিকর্মীর পরিবার থেকে!
জমির শ্রেণি সংশোধনের দাবিতে মাহবুব হোসেন ২০২৪ সালের ২ জুন ও ২৪ জুন জেলা প্রশাসক ও ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তার কাছে লিখিত আবেদন করেন। দলিলসহ জমা দেন সংশ্লিষ্ট সকল নথি।
তবু এক বছর পেরিয়ে গেলেও প্রশাসন কোনো পদক্ষেপ নেয়নি, এমনকি আবেদনকারীকেও জানানো হয়নি কিছু।
এখন প্রশ্ন উঠছে— 👉 কীভাবে স্পষ্ট নথিপত্র উপেক্ষা করে শ্রেণি পরিবর্তন হলো?
👉 কে বা কারা এই ‘ভুল’ করলো, এবং কাদের স্বার্থে?
ভূমি অধিগ্রহণ সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়—ময়মনসিংহ জেলায় জমির শ্রেণি ঠিক রাখতে হলে মোট ক্ষতিপূরণের একটি নির্ধারিত শতাংশ পর্যন্ত ঘুষ দিতে হয়। এটি এখন ‘কমিশন রেট’ হিসেবে অঘোষিত নিয়ম হয়ে গেছে। চুক্তিতে না এলে বা নির্দিষ্ট মহলের কথা না মানলে গায়েব হয়ে যায় মূল নথি, ঢুকে পড়ে ‘ভুল’ শ্রেণি।
প্রশ্ন উঠছে—এভাবে কাদের যোগসাজশে চলে শ্রেণি বদলের এই হাটবাজার?
শহরের একজন সুপরিচিত সংস্কৃতিকর্মীর পরিবার যদি নিজেদের ন্যায্য অধিকার না পান, তবে একজন সাধারণ কৃষক বা শ্রমজীবীর কী পরিণতি হতে পারে?
সুধীমহলের মতে, এটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটি একটি নীতিগত দুর্নীতির দলিল। অনুসন্ধান ও বিচার না হলে ভবিষ্যতে আরও অগণিত ক্ষতিপূরণপ্রত্যাশী পরিবার ধ্বংস হবে।
ভুক্তভোগী পরিবারের বক্তব্য—
“আমরা চাই, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সরেজমিনে গিয়ে আমাদের জমির প্রকৃত শ্রেণি পর্যালোচনা করে, পুনঃতদন্ত করে আমাদের বৈধ প্রাপ্য বুঝিয়ে দিন। এটা আমাদের অধিকার।”
শ্রেণি পরিবর্তনের এই অদৃশ্য অপারেশন কেবল অর্থনৈতিক লুটপাট নয়, এটি রাষ্ট্রীয় ন্যায়ের উপর সরাসরি আঘাত।
প্রশাসনের নিরবতা, সংশ্লিষ্ট দপ্তরের জবাবহীনতা, এবং দলিলসাপেক্ষ বাস্তবতাকে উপেক্ষা করা—সব মিলিয়ে এই ঘটনা একটি বড়সড় সতর্ক সংকেত





















