ময়মনসিংহের ‘ঘুণশিল্পী’ ইকবাল, যার শিল্পে মুগ্ধ দেশ-বিদেশ
- আপডেট সময় : ১০:০১:১৩ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১ জুলাই ২০২৬
- / 22
নিজস্ব প্রতিবেদক, ময়মনসিংহ
ময়মনসিংহের কাঁচিঝুলি এলাকায় ময়মনসিংহ-টাঙ্গাইল মহাসড়কের পাশে একটি ছোট্ট নার্সারি। বাইরে থেকে দেখলে এটি সাধারণ গাছের দোকান বলেই মনে হয়। তবে ভেতরে ঢুকলেই চোখে পড়ে এক ভিন্ন জগৎ—যেখানে নেই রং-তুলি, নেই দামি ক্যানভাস। আছে শুধু ঘুণে কাটা কাঠের গুঁড়া, আঠা আর অসীম ধৈর্য। আর এই উপকরণ দিয়েই একের পর এক ব্যতিক্রমী শিল্পকর্ম তৈরি করছেন ইকবাল হোসেন, যিনি সবার কাছে পরিচিত ‘ঘুণশিল্পী’ নামে।
৪৬ বছর বয়সী ইকবাল হোসেন, ওরফে মোহন আকন্দ, দিনের বড় একটি সময় কাটান তার এই নার্সারিতে। একদিকে গাছের পরিচর্যা ও বিক্রি, অন্যদিকে ঘুণে ধরা কাঠের গুঁড়া দিয়ে নিখুঁত হাতে তৈরি করেন অসাধারণ সব চিত্রকর্ম। তার শিল্পে ফুটে ওঠে জাতীয় কবি Kazi Nazrul Islam, Ziaur Rahman থেকে শুরু করে Queen Elizabeth II-এর মতো বিশ্বখ্যাত ব্যক্তিত্বদের প্রতিকৃতি, পাশাপাশি প্রকৃতির নান্দনিক দৃশ্যও।
সম্প্রতি তার নার্সারিতে গিয়ে দেখা যায়, নতুন একটি শিল্পকর্ম তৈরির প্রস্তুতিতে ব্যস্ত তিনি। ঘুণে ধরা কাঠের গুঁড়া চালুনি দিয়ে চেলে ময়লা আলাদা করছেন। পরে সেগুলো যত্ন করে বোতলে সংরক্ষণ করছেন। ইকবাল জানান, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বাসাবাড়ি থেকে এসব গুঁড়া সংগ্রহ করেন তিনি। এরপর কাগজের বোর্ডে কালো কাপড় লাগিয়ে ক্যানভাস তৈরি করা হয়। পেনসিল দিয়ে কাঠামো এঁকে সেখানে আঠা লাগিয়ে তার ওপর ছড়িয়ে দেওয়া হয় কাঠের গুঁড়া। শুকিয়ে গেলে ধীরে ধীরে ভেসে ওঠে কাঙ্ক্ষিত প্রতিচ্ছবি।
এই শিল্পযাত্রার শুরু অবশ্য সহজ ছিল না। অভাব-অনটনের কারণে অষ্টম শ্রেণির পর আর পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেননি ইকবাল। জীবিকার প্রয়োজনে শিখেছিলেন চুমকি, জরি, কটনবাড ও দেশলাইয়ের কাঠি দিয়ে ওয়ালম্যাট তৈরির কাজ।
১৯৯৮ সালে এক বন্ধুর বাড়ি বদলের সময় খাটের নিচে পড়ে থাকা কিছু ঘুণে ধরা কাঠের গুঁড়া তার চোখে পড়ে। সেখান থেকেই মাথায় আসে নতুন ভাবনা—যদি জরি বা চুমকি দিয়ে শিল্প তৈরি করা যায়, তবে কাঠের গুঁড়া দিয়েও কেন নয়? সেই কৌতূহল থেকেই শুরু হয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা। ধীরে ধীরে আঠার সঙ্গে কাঠের গুঁড়া ব্যবহার করে তৈরি হতে থাকে তার প্রথম শিল্পকর্ম।
ইকবাল জানান, বর্তমানে কাঁচামালের তেমন অভাব হয় না। পরিচিতজনেরা নিজেরাই কাঠের গুঁড়া এনে দেন, আবার অনেক সময় তিনি নিজেও সংগ্রহ করেন। মেহেগনি, কাঁঠাল ও কেরোসিন কাঠের গুঁড়ায় সবচেয়ে ভালো কাজ হয়। বিভিন্ন কাঠের গুঁড়ার রংও ভিন্ন হওয়ায় শিল্পকর্মে আলাদা মাত্রা যোগ করে।
তার ভাষায়, এই শিল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো আঠা লাগানো। সামান্য ভুল হলেই পুরো কাজ নষ্ট হয়ে যেতে পারে। তাই প্রতিটি ধাপে প্রয়োজন ধৈর্য, মনোযোগ ও নিখুঁত হাতের কাজ।
মানুষের একটি প্রতিকৃতি তৈরি করতে সময় লাগে ১৫ থেকে ২০ দিন। আর প্রাকৃতিক দৃশ্যের শিল্পকর্ম তৈরি হয় এক থেকে দুই দিনে। আকারভেদে তার শিল্পকর্মের মূল্য ৩০০ টাকা থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত। ছোট ওয়ালম্যাট ৩০০ টাকা, মাঝারি শিল্পকর্ম ১ হাজার ৫০০ থেকে ৫ হাজার টাকা এবং প্রতিকৃতি বিক্রি হয় ৮ থেকে ১০ হাজার টাকায়।
দেশের পাশাপাশি বিদেশেও রয়েছে তার শিল্পকর্মের কদর। ২০০০ সালে প্রথমবার নিজের কাজ নিয়ে প্রদর্শনীর আয়োজন করেন ইকবাল। পরে ময়মনসিংহ নগরের জয়নুল আবেদিন উদ্যানে আরও কয়েকটি প্রদর্শনী করেন। World Vision-এর মাধ্যমে তার কিছু শিল্পকর্ম যুক্তরাষ্ট্র, China, Japan, Netherlands, New Zealand ও Kenyaসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পৌঁছেছে।
বর্তমানে নার্সারি ও শিল্পকর্ম বিক্রির আয়েই স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে স্বচ্ছন্দে জীবনযাপন করছেন তিনি। যে ঘুণে ধরা কাঠের গুঁড়াকে মানুষ মূল্যহীন মনে করে ফেলে দেয়, সেই গুঁড়াকেই শিল্পে রূপ দিয়ে তৈরি করেছেন নিজের আলাদা পরিচয়।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা জানিয়ে ইকবাল বলেন, শিল্পকর্ম বিক্রির আয় দিয়ে সুবিধাবঞ্চিত ও পথশিশুদের জন্য স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠা করতে চান। পাশাপাশি নিজের একটি আর্ট গ্যালারি গড়ার স্বপ্নও দেখেন।
স্থানীয়দের মতে, ইকবালের এই সৃজনশীল উদ্যোগ শুধু তাকে আলাদা পরিচিতিই দেয়নি, বরং ময়মনসিংহের জন্যও তৈরি করেছে এক অনন্য শিল্পপরিচয়।
ময়মনসিংহ বিভাগীয় চারুশিল্পী পর্ষদের সভাপতি মো. রাজন বলেন, একাডেমিক প্রশিক্ষণ না থাকলেও ইকবালের নিষ্ঠা, ধৈর্য ও নিয়মিত চর্চা তার শিল্পকে স্বতন্ত্র করেছে। ঘুণের গুঁড়া দিয়ে কাজ করার এই ধারা লোকশিল্পের এক ব্যতিক্রমী উদাহরণ। তার জানা মতে, ময়মনসিংহে বর্তমানে এমন কাজ একমাত্র ইকবাল হোসেনই করছেন।
















