দেড়শ বছরের মঞ্চনাট্যের শহর ময়মনসিংহ: গৌরব, অবক্ষয় ও এক অনিবার্য প্রশ্ন
- আপডেট সময় : ১১:৩৬:৩৭ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১০ জানুয়ারী ২০২৬
- / 214
বাংলার প্রশাসনিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসে ময়মনসিংহ একটি অনিবার্য নাম। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনামলে প্রশাসনিক প্রয়োজনে ১৭৮৭ সালের ১লা মে ময়মনসিংহ জেলা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। এর চার বছর পর, ১৭৯১ সালে কালেক্টর অফিসকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে ময়মনসিংহ শহর। সে সময় অঞ্চলটি ছিল মুক্তাগাছার প্রখ্যাত মহারাজার জমিদারির অন্তর্ভুক্ত।
নগরায়ণের ধারাবাহিকতায় ১৮৬৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ময়মনসিংহ পৌরসভা। এই সময় থেকেই ময়মনসিংহ কেবল একটি প্রশাসনিক কেন্দ্র নয়, বরং শিক্ষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির এক গুরুত্বপূর্ণ জনপদে রূপ নিতে শুরু করে। এই সাংস্কৃতিক বিকাশের সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় রচিত হয় মঞ্চনাট্যের মাধ্যমে।
অমরাবতী ও ময়মনসিংহের নাট্যজাগরণ
বাংলার মঞ্চনাটকের ইতিহাসে ময়মনসিংহ প্রায় দেড়শ বছরের যে সমৃদ্ধ ঐতিহ্য বহন করে, তার কেন্দ্রে রয়েছে অমরাবতী নাট্য সমাজ। ঐতিহাসিক সূত্র অনুযায়ী অমরাবতীর প্রতিষ্ঠা ১৮৯২ সালে। তবে মতান্তরে জানা যায়, ১৮৮৫ সালে ‘আর্য থিয়েটার্স’ নামে এর কার্যক্রম শুরু হয়।
জমিদার, শিক্ষিত চাকুরিজীবী, আইনজীবী ও তৎকালীন বুদ্ধিজীবীদের সম্মিলিত উদ্যোগে গড়ে ওঠা এই নাট্যসংগঠন দীর্ঘদিন পূর্ববঙ্গের সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র হিসেবে কাজ করেছে।
অমরাবতীর পাশাপাশি উনিশ শতকের শেষভাগ ও বিশ শতকের শুরুর দিকে ময়মনসিংহ শহরে গড়ে ওঠে একাধিক নাট্যসংগঠন। ছোট বাজার এলাকায় প্রতিষ্ঠিত হয় ‘সুহৃদ নাট্য সমাজ’, জুবলি ঘাটে ‘বীণাপাণি ড্রামাটিক ক্লাব’ এবং আকুয়া এলাকায় ‘চপলা নাট্য সমাজ’। বিভিন্ন লেখালেখিতে আরও কিছু নাট্যসংগঠনের উল্লেখ থাকলেও প্রামাণ্য সূত্রে এই নামগুলোই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্যভাবে চিহ্নিত। এসব সংগঠনের সক্রিয়তায় ময়মনসিংহ একসময় পরিণত হয় পূর্ববঙ্গের অন্যতম প্রাণবন্ত নাট্যনগরীতে।
নাট্যমন্দিরের স্বপ্ন ও নির্মাণ

অমরাবতীর প্রথম দিককার নাটকগুলো মঞ্চস্থ হতো মহারাজা রোডের নিয়োগী বাড়ির মাঠে অস্থায়ী মঞ্চে। সে সময় জমিদার বিজয় কমল নিয়োগী ছিলেন নাট্যচর্চার একজন গুরুত্বপূর্ণ পৃষ্ঠপোষক। তবে সংগঠনের সদস্যদের মধ্যে ধীরে ধীরে একটি স্থায়ী নাট্যমঞ্চের তীব্র প্রয়োজন অনুভূত হতে থাকে।
এই স্বপ্ন বাস্তবায়নে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন ময়মনসিংহ নাট্যাঙ্গনের কিংবদন্তি ব্যক্তিত্ব শ্রী রমেশ চন্দ্র দাস। কালেক্টর অফিসে অ্যাসিস্ট্যান্ট ক্লার্ক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করে পরে নাজির পদে উন্নীত হওয়া এই সাংস্কৃতিক সংগঠক ১৯১০ সালে অমরাবতীতে যোগ দেন এবং অচিরেই সংগঠনের প্রাণপুরুষে পরিণত হন।
গৌরীপুরের জমিদার ব্রজেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের সূত্র ধরে একটি স্থায়ী নাট্যমন্দির নির্মাণের উদ্যোগ বাস্তব রূপ পেতে শুরু করে। সেনবাড়ির জমিদার সুরেন্দ্রনাথ সেনগুপ্তের বাড়ির বিপরীতে একটি জঙ্গলাকীর্ণ জমি নির্বাচন করা হয়। প্রথমে নয় বছরের জন্য লিজ নেওয়া হলেও পরে মুক্তাগাছার জমিদার মহারাজ শশীকান্তের কাছ থেকে পাট্টা কবুলিয়াতের মাধ্যমে জমিটি অমরাবতীর নামে স্থায়ীভাবে অধিগ্রহণ করা হয়।
নাট্যমন্দির নির্মাণে আর্থিক সহায়তা দেন জমিদার ও আইনজীবী সুরেন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত নিজেই। অর্থসংগ্রহের জন্য তৎকালীন ইংরেজ কালেক্টর মিস্টার ব্লেয়ার রমেশ চন্দ্র দাসকে তিন মাসের সবেতন ছুটিও প্রদান করেন।
১৯২৪ সালের ৩০ নভেম্বর নাট্যমন্দির নির্মাণ কমিটি গঠিত হয়। সভাপতি ছিলেন ইংরেজ জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মিস্টার জে. আর. ব্লেয়ার এবং সম্পাদক রায় বাহাদুর শশধর ঘোষ। দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে ১৯২৭ সালে, বাংলা ১৩৩৪ সনের ১১ই অগ্রহায়ণ ‘মাধবরাও’ নাটক মঞ্চায়নের মধ্য দিয়ে অমরাবতী নাট্যমন্দিরের শুভ উদ্বোধন হয়।
নারী অভিনয় ও অমরাবতীর শেষ প্রযোজনা
ষাটের দশক পর্যন্ত অমরাবতীর মঞ্চে নারী চরিত্রে অভিনয় করতেন পুরুষ শিল্পীরাই। পরবর্তীকালে ঢাকার পেশাদার নারী শিল্পীদের অংশগ্রহণ শুরু হয়। ১৯৬১ সালে ‘কালিন্দী’ নাটকে চিন্তা হরণ সরকারের কন্যা ছায়া সরকারের অভিনয়কে ময়মনসিংহের প্রথম নারী মঞ্চাভিনয় হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
১৯৬৬ সালে ডাক্তার অবনী নন্দীর পরিচালনায় ‘অংশীদার’ নাটকের মঞ্চায়ন ছিল অমরাবতী নাট্য সমাজের সর্বশেষ প্রযোজনা। এরপর নানা সাংগঠনিক ও ব্যবস্থাপনাগত সমস্যায় অমরাবতী কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে—যা ময়মনসিংহের নাট্য ইতিহাসে এক বেদনাবিধুর অধ্যায়।
স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম নাটক ও ময়মনসিংহ
ময়মনসিংহের নাট্য ইতিহাসে আরেকটি অবিস্মরণীয় অধ্যায় যুক্ত হয় মহান মুক্তিযুদ্ধের অব্যবহিত পর। ১৮ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে ময়মনসিংহ টাউন হল ময়দানে মঞ্…



















