ঢাকা ০১:৩২ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
মালয়েশিয়ায় আন্তর্জাতিক সম্মেলনে ‘গ্লোবাল এক্সিলেন্স লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ড ২০২৬’ পেলেন সংগীতশিল্পী লায়ন মো. ওমর ফারুক দক্ষিণ কেরানীগঞ্জে দুই কিশোরীকে ধর্ষণের অভিযোগ, পুলিশের সোর্স সাগর গ্রেপ্তার নবাবগঞ্জে ডিবি পুলিশের অভিযানে ইয়াবাসহ ৩ জন গ্রেপ্তার। আইইডিসিআর-এর পরিচালককে নিজ কার্যালয়ে মারধরের অভিযোগ আট বিভাগে বৃষ্টির আভাস, কমবে তাপমাত্রা এসআরবি-১৪, সিপিএসসি, ময়মনসিংহ এর পৃথক অভিযানে হত্যা ও অপহরণ মামলার ০২ আসামি গ্রেফতার। পুরান ঢাকায় এক পঙ্গু হতদরিদ্র ব্যক্তিকে হুইলচেয়ার উপহার দিলো ছাত্রদল নেতারা  হযরতপুরে চাচা হাজী দুঃখ মিয়া বিরুদ্ধে জাল দলিল ও জমি দখলের অভিযোগ তুলেছে ভাতিজা আলা. পুরান ঢাকার সফল সংগঠক মোস্তাকের জন্মদিন পালিত কেরানীগঞ্জে ডিবি পুলিশের অভিযানে ৫০ পিস ইয়াবাসহ একজন গ্রেপ্তার

ময়মনসিংহের প্রতিবন্ধী নারীদের কারুপণ্য এখন ইউরোপ-আমেরিকায়

অনলাইন ডেস্ক
  • আপডেট সময় : ০৮:২৩:৩৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ৮ মার্চ ২০২৬
  • / 159
আজকের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

ময়মনসিংহ নগরীর কাঁচিঝুলির জয়নুল রোডের একটি পুরোনো ভবনে চলছে ব্যতিক্রমী এক কর্মযজ্ঞ। এখানে ‘প্রতিবন্ধী আত্ম-উন্নয়ন সংস্থা’র তত্ত্বাবধানে শারীরিক প্রতিবন্ধী নারীরা তৈরি করছেন কার্পেট, শতরঞ্জিসহ নানা ধরনের কারুপণ্য। তাদের নিপুণ হাতের স্পর্শে তৈরি এসব পণ্য এখন ইউরোপ-আমেরিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হচ্ছে।

বাবা-মায়ের মৃত্যুর পর বড় বোন ও ছোট বোনের দায়িত্ব এসে পড়ে শারীরিক প্রতিবন্ধী নপালীর কাঁধে। কঠিন জীবনসংগ্রামের মধ্য দিয়েই তিনি দুই বোনকে পড়ালেখা করিয়ে বিয়ে দিয়েছেন। এখন তাদের সংসার গুছিয়ে দেওয়ার পর নিজ জীবন নিয়ে অনেকটাই স্বস্তিতে আছেন তিনি। নেত্রকোনার সুসং দুর্গাপুরের বাসিন্দা নপালী ২০০৭ সাল থেকে এখানে কাজ করছেন। এই কাজই বদলে দিয়েছে তার ভাগ্য।

ময়মনসিংহ নগরীর কাঁচিঝুলির জয়নুল রোডের ওই পুরোনো ভবনে বসেই কার্পেট বুননের কাজ করেন এই তরুণী। জন্মের পর থেকেই পোলিওতে আক্রান্ত নপালী এখন ৩৫ বছর বয়সী। দুই চাকার হুইলচেয়ার আর চার দেয়ালের ঘরের ভেতরেই তার কর্মজীবন। তাঁতের খটখট শব্দের মধ্যেই তিনি বুনে চলেন নান্দনিক নকশার কার্পেট।

তিনি বলেন, ২০০৭ সাল থেকে এখানে আসেন। লেখাপড়া জানতেন না। ৬ মাস কাজ শিখেছেন পাশাপাশি লেখাপড়া করেছেন। এখন তিনি সব কাজ পারেন। সেলাই করেন, কার্পেটের কাজও পারেন।

শুধু নপালীই নন, তার মতো আরও অনেক বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন নারী এখানে কাজ করছেন। তাদের কেউ কথা বলতে পারেন না, কেউ কানে শোনেন না, কেউবা জটিল রোগে আক্রান্ত বা চোখে কম দেখেন। তবুও থেমে নেই তাদের কাজের গতি।

ঘরের চারপাশে ছড়িয়ে আছে তাদের তৈরি চোখ ধাঁধানো নকশার কার্পেট, মেয়েদের ব্যাগ, সিঁকেসহ নানা ধরনের কুটির পণ্য। মূলত ঝুট, পুরোনো কাপড়, রিসাইকেল সুতা ও বিভিন্ন উপকরণ দিয়ে তৈরি হয় এসব পণ্য। এখানকার কারিগররাই নকশা তৈরি করেন এবং তারাই উৎপাদক।

রিতা আক্তার নামে আরেক কর্মী জানান, তিনি জানতেন না এখানে এতো প্রতিবন্ধী আছে। এখানে এসে দেখেছেন, কাজ শিখে নিজেই নিজের চাহিদা পূরণ করতে পারছেন।

ময়মনসিংহে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন নারীদের হাতে তৈরি এসব নান্দনিক কারুপণ্য এখন দেশ ছাড়িয়ে বিদেশেও সমাদৃত। সুতা, ঝুট ও পুরোনো কাপড়ে তৈরি দৃষ্টিনন্দন ডিজাইন এবং মানসম্মত হওয়ায় এসব পণ্য যাচ্ছে ফ্রান্স, জাপান, বেলজিয়ামসহ ইউরোপ ও আমেরিকার বিভিন্ন দেশে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা এবং একটি স্থায়ী কারখানা নির্মাণের জন্য জায়গা পেলে প্রতিবন্ধী নারীদের জন্য আরও বড় কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা সম্ভব।

প্রতিবন্ধীদের তৈরি পণ্য বিক্রির জন্য ‘প্রজাপতি ক্রাফট’ নামে একটি নিজস্ব শোরুমও রয়েছে। সেখানে পুতুল, মোমবাতি, কার্পেটসহ বিভিন্ন ধরনের কারুপণ্য বিক্রি করা হয়।

প্রতিবন্ধী আত্ম-উন্নয়ন সংস্থা নির্বাহী পরিচালক শেফালী আক্তার জানান, এইটা প্রতিবন্ধীদের জন্যই সেবামূলক কাজ। এখানে যারা কাজ করেন, সকলেই প্রতিবন্ধী। যারা পরিচালনা করেন, তারাও প্রতিবন্ধী। ছোট-বড় মিলিয়ে ২৫০ জন সদস্য আছে এই সংস্থার। আমাদের মূল উদ্দেশ্যই হলো প্রতিবন্ধী নারীদের স্বাবলম্বী করা।

‘প্রতিবন্ধী আত্ম-উন্নয়ন সংস্থা’ ময়মনসিংহে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের আত্মউন্নয়ন এবং সমাজের মূল স্রোতে যুক্ত করার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। প্রতিবছর প্রতিষ্ঠানটি প্রতিবন্ধীদের জন্য সেলাই, কম্পিউটার প্রশিক্ষণসহ বিভিন্ন কারিগরি প্রশিক্ষণের আয়োজন করে থাকে।

জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালক রাজু আহমেদ বলেন, প্রতিবন্ধী নারীদের নিয়ে যে উদ্যোগটা নেওয়া হয়েছে, খুবই ভালো একটা উদ্যোগ। আমাদের পক্ষ থেকে তাদের যথাসাধ্য সহযোগিতা করা হয়। আমরা তাদের কাজের প্রশংসা করি।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

ময়মনসিংহের প্রতিবন্ধী নারীদের কারুপণ্য এখন ইউরোপ-আমেরিকায়

আপডেট সময় : ০৮:২৩:৩৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ৮ মার্চ ২০২৬

ময়মনসিংহ নগরীর কাঁচিঝুলির জয়নুল রোডের একটি পুরোনো ভবনে চলছে ব্যতিক্রমী এক কর্মযজ্ঞ। এখানে ‘প্রতিবন্ধী আত্ম-উন্নয়ন সংস্থা’র তত্ত্বাবধানে শারীরিক প্রতিবন্ধী নারীরা তৈরি করছেন কার্পেট, শতরঞ্জিসহ নানা ধরনের কারুপণ্য। তাদের নিপুণ হাতের স্পর্শে তৈরি এসব পণ্য এখন ইউরোপ-আমেরিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হচ্ছে।

বাবা-মায়ের মৃত্যুর পর বড় বোন ও ছোট বোনের দায়িত্ব এসে পড়ে শারীরিক প্রতিবন্ধী নপালীর কাঁধে। কঠিন জীবনসংগ্রামের মধ্য দিয়েই তিনি দুই বোনকে পড়ালেখা করিয়ে বিয়ে দিয়েছেন। এখন তাদের সংসার গুছিয়ে দেওয়ার পর নিজ জীবন নিয়ে অনেকটাই স্বস্তিতে আছেন তিনি। নেত্রকোনার সুসং দুর্গাপুরের বাসিন্দা নপালী ২০০৭ সাল থেকে এখানে কাজ করছেন। এই কাজই বদলে দিয়েছে তার ভাগ্য।

ময়মনসিংহ নগরীর কাঁচিঝুলির জয়নুল রোডের ওই পুরোনো ভবনে বসেই কার্পেট বুননের কাজ করেন এই তরুণী। জন্মের পর থেকেই পোলিওতে আক্রান্ত নপালী এখন ৩৫ বছর বয়সী। দুই চাকার হুইলচেয়ার আর চার দেয়ালের ঘরের ভেতরেই তার কর্মজীবন। তাঁতের খটখট শব্দের মধ্যেই তিনি বুনে চলেন নান্দনিক নকশার কার্পেট।

তিনি বলেন, ২০০৭ সাল থেকে এখানে আসেন। লেখাপড়া জানতেন না। ৬ মাস কাজ শিখেছেন পাশাপাশি লেখাপড়া করেছেন। এখন তিনি সব কাজ পারেন। সেলাই করেন, কার্পেটের কাজও পারেন।

শুধু নপালীই নন, তার মতো আরও অনেক বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন নারী এখানে কাজ করছেন। তাদের কেউ কথা বলতে পারেন না, কেউ কানে শোনেন না, কেউবা জটিল রোগে আক্রান্ত বা চোখে কম দেখেন। তবুও থেমে নেই তাদের কাজের গতি।

ঘরের চারপাশে ছড়িয়ে আছে তাদের তৈরি চোখ ধাঁধানো নকশার কার্পেট, মেয়েদের ব্যাগ, সিঁকেসহ নানা ধরনের কুটির পণ্য। মূলত ঝুট, পুরোনো কাপড়, রিসাইকেল সুতা ও বিভিন্ন উপকরণ দিয়ে তৈরি হয় এসব পণ্য। এখানকার কারিগররাই নকশা তৈরি করেন এবং তারাই উৎপাদক।

রিতা আক্তার নামে আরেক কর্মী জানান, তিনি জানতেন না এখানে এতো প্রতিবন্ধী আছে। এখানে এসে দেখেছেন, কাজ শিখে নিজেই নিজের চাহিদা পূরণ করতে পারছেন।

ময়মনসিংহে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন নারীদের হাতে তৈরি এসব নান্দনিক কারুপণ্য এখন দেশ ছাড়িয়ে বিদেশেও সমাদৃত। সুতা, ঝুট ও পুরোনো কাপড়ে তৈরি দৃষ্টিনন্দন ডিজাইন এবং মানসম্মত হওয়ায় এসব পণ্য যাচ্ছে ফ্রান্স, জাপান, বেলজিয়ামসহ ইউরোপ ও আমেরিকার বিভিন্ন দেশে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা এবং একটি স্থায়ী কারখানা নির্মাণের জন্য জায়গা পেলে প্রতিবন্ধী নারীদের জন্য আরও বড় কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা সম্ভব।

প্রতিবন্ধীদের তৈরি পণ্য বিক্রির জন্য ‘প্রজাপতি ক্রাফট’ নামে একটি নিজস্ব শোরুমও রয়েছে। সেখানে পুতুল, মোমবাতি, কার্পেটসহ বিভিন্ন ধরনের কারুপণ্য বিক্রি করা হয়।

প্রতিবন্ধী আত্ম-উন্নয়ন সংস্থা নির্বাহী পরিচালক শেফালী আক্তার জানান, এইটা প্রতিবন্ধীদের জন্যই সেবামূলক কাজ। এখানে যারা কাজ করেন, সকলেই প্রতিবন্ধী। যারা পরিচালনা করেন, তারাও প্রতিবন্ধী। ছোট-বড় মিলিয়ে ২৫০ জন সদস্য আছে এই সংস্থার। আমাদের মূল উদ্দেশ্যই হলো প্রতিবন্ধী নারীদের স্বাবলম্বী করা।

‘প্রতিবন্ধী আত্ম-উন্নয়ন সংস্থা’ ময়মনসিংহে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের আত্মউন্নয়ন এবং সমাজের মূল স্রোতে যুক্ত করার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। প্রতিবছর প্রতিষ্ঠানটি প্রতিবন্ধীদের জন্য সেলাই, কম্পিউটার প্রশিক্ষণসহ বিভিন্ন কারিগরি প্রশিক্ষণের আয়োজন করে থাকে।

জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালক রাজু আহমেদ বলেন, প্রতিবন্ধী নারীদের নিয়ে যে উদ্যোগটা নেওয়া হয়েছে, খুবই ভালো একটা উদ্যোগ। আমাদের পক্ষ থেকে তাদের যথাসাধ্য সহযোগিতা করা হয়। আমরা তাদের কাজের প্রশংসা করি।