গোপন ভিডিও ও অপপ্রচার: অনুসন্ধানী সাংবাদিককে থামাতে মরিয়া অপরাধী চক্র
- আপডেট সময় : ০৪:২৫:১৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩১ জানুয়ারী ২০২৬
- / 121
ময়মনসিংহে মাদক ও চাঁদাবাজিবিরোধী অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় ধারাবাহিক, তথ্যনির্ভর ও সাহসী প্রতিবেদন প্রকাশ করে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছেন তরুণ সাংবাদিক মামুনুর রশীদ মামুন। তবে সত্য প্রকাশের এই পথ সহজ ছিল না। বরং তার অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে ক্ষতিগ্রস্ত অপরাধী চক্র এখন ভয়ভীতি, হুমকি, সংঘবদ্ধ অপপ্রচার ও পরিকল্পিত চরিত্রহননের মাধ্যমে তাকে থামাতে মরিয়া হয়ে উঠেছে।
অনুসন্ধানী সাংবাদিকতাই ‘অপরাধ’ হয়ে উঠেছে
একাধিক সূত্র জানায়, মামুনুর রশীদের প্রকাশিত প্রতিবেদনে একাধিক মাদক কারবারি ও পেশাদার চাঁদাবাজ চক্র আর্থিক ও সাংগঠনিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর প্রতিক্রিয়ায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার বিরুদ্ধে শুরু হয় পরিকল্পিত অপপ্রচার। উদ্দেশ্য একটাই—একজন অনুসন্ধানী সাংবাদিককে ভয় দেখিয়ে থামিয়ে দেওয়া এবং ভবিষ্যতে কেউ যেন এসব চক্রের বিরুদ্ধে কলম ধরতে সাহস না পায়।
অনুসন্ধানী কাজের অংশ হিসেবে সাংবাদিক মামুন কৌশলগতভাবে সন্দেহভাজনদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেন। সেই সূত্র ধরে তিনি চিহ্নিত করেন একাধিক মাদক ব্যবসায়ী, তাদের অর্থনৈতিক লেনদেন ও নেটওয়ার্ক। তার প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বিভিন্ন সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কয়েকজন মাদক কারবারিকে গ্রেপ্তারও করে—যা অপরাধী চক্রের জন্য বড় আঘাত হয়ে দাঁড়ায়।
গোপন ভিডিও, বিকৃত উপস্থাপন ও চরিত্রহননের চেষ্টা
সাংবাদিক মামুনুর রশীদ মামুন অভিযোগ করেন, তাকে গোপনে ভিডিও ধারণ করা হয়। পরবর্তীতে সেই ভিডিও কৌশলে সম্পাদনা ও বিকৃতভাবে উপস্থাপন করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়, যাতে তাকে নৈতিকভাবে হেয় করা যায় এবং তার অনুসন্ধানী কাজ প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
এ বিষয়ে তিনি বলেন,
“আমি একজন সাংবাদিক হিসেবে সমাজের স্বার্থেই কাজ করছি। মাদক ও চাঁদাবাজি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি। এসবের বিরুদ্ধে কলম ধরেছি বলেই আজ আমাকে ভয় দেখানোর চেষ্টা চলছে। কিন্তু অপপ্রচার বা হুমকিতে আমি থামবো না।”
তিনি আরও বলেন,
“এই লড়াই ব্যক্তি মামুনের নয়—এটা সমাজের। সৎ থাকলে ভয় পাওয়ার কিছু নেই।”
সন্ত্রাসে অচল ময়মনসিংহ: এক চাঁদাবাজ চক্রের দাপট
ময়মনসিংহ নগরীতে সংঘবদ্ধ সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। অভিযুক্ত জাহাঙ্গীর ওরফে ‘সুন্দরী জাহাঙ্গীর’ ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান বন্ধ, সরকারি উন্নয়ন কাজে বাধা এবং সংবাদকর্মীর ওপর সশস্ত্র হামলার গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।
মাদ্রাসায় অনুপ্রবেশ ও দেড় লাখ টাকা চাঁদা
২৩ জুন ২০২৫ রাত আনুমানিক ১০টার দিকে ময়মনসিংহ সিটি কর্পোরেশনের ১৯ নম্বর ওয়ার্ডের পালপাড়ায় অবস্থিত মদিনাতুল কোরআন ওয়াস সুন্নাহ মাদ্রাসায় অনুপ্রবেশ করে জাহাঙ্গীর ও তার ১৫–২০ জন সহযোগী।
মাদ্রাসার পরিচালক মাওলানা মো. আলামিনের কাছে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। টাকা না দিলে প্রাণনাশ ও মাদ্রাসা বন্ধ করে দেওয়ার হুমকিতে চরম নিরাপত্তাহীনতায় শেষ পর্যন্ত মাদ্রাসা বন্ধ করে সংশ্লিষ্টরা এলাকা ছাড়তে বাধ্য হন।
সরকারি সড়ক নির্মাণে বাধা ও মারধর
৫ ডিসেম্বর ২০২৫ রাত আনুমানিক ২টার দিকে আলীয়া মাদ্রাসা থেকে কারিতাস মোড় পর্যন্ত সড়ক নির্মাণ প্রকল্পে চাঁদা দাবি করে হামলা চালানো হয়। এতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার মোস্তাফিজুর রহমান টুটুল মারধরের শিকার হন।
পরে পুলিশ অভিযুক্ত জাহাঙ্গীরকে গ্রেপ্তার করলেও গুরুতর অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তাকে ফৌজদারি কার্যবিধির ৫১ ধারায় আদালতে পাঠানো হয়। পরদিন জামিনে মুক্তি পেয়ে তিনি আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন বলে অভিযোগ।
সংবাদকর্মীর ওপর সশস্ত্র হামলা, লুট ও জিম্মি
সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনা ঘটে ২৭ ডিসেম্বর ২০২৫। ময়মনসিংহ নগরীর বলাশপুর এলাকায় এক সংবাদকর্মীর ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে দেশীয় অস্ত্রসহ হামলা চালানো হয়।
মারধর করে ২টি ইজিবাইক ও নগদ ২০ হাজার টাকা ছিনিয়ে নেওয়া হয়। অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর আদায়, মিথ্যা স্বীকারোক্তিমূলক ভিডিও ধারণ, সিসিটিভি ফুটেজ মুছে ফেলা এবং মামলা করলে খুন ও লাশ গুমের হুমকি দেওয়া হয়।
পরবর্তীতে ৫–৬ জানুয়ারি ও ২০ জানুয়ারি ভোরে বাসা পরিবর্তনের সময় আবারও হামলার শিকার হন ওই সংবাদকর্মী। অভিযোগ রয়েছে, পুলিশকে জানানো হলেও সময়মতো কার্যকর সহায়তা পাওয়া যায়নি।
প্রশ্নের মুখে প্রশাসন
একই ব্যক্তি বারবার ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, সরকারি প্রকল্প ও সংবাদকর্মীদের ওপর হামলার ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের মতে, দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা না নিলে অপরাধী চক্র আরও বেপরোয়া হয়ে উঠবে।













