ঢাকা ০১:১৯ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
মালয়েশিয়ায় আন্তর্জাতিক সম্মেলনে ‘গ্লোবাল এক্সিলেন্স লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ড ২০২৬’ পেলেন সংগীতশিল্পী লায়ন মো. ওমর ফারুক দক্ষিণ কেরানীগঞ্জে দুই কিশোরীকে ধর্ষণের অভিযোগ, পুলিশের সোর্স সাগর গ্রেপ্তার নবাবগঞ্জে ডিবি পুলিশের অভিযানে ইয়াবাসহ ৩ জন গ্রেপ্তার। আইইডিসিআর-এর পরিচালককে নিজ কার্যালয়ে মারধরের অভিযোগ আট বিভাগে বৃষ্টির আভাস, কমবে তাপমাত্রা এসআরবি-১৪, সিপিএসসি, ময়মনসিংহ এর পৃথক অভিযানে হত্যা ও অপহরণ মামলার ০২ আসামি গ্রেফতার। পুরান ঢাকায় এক পঙ্গু হতদরিদ্র ব্যক্তিকে হুইলচেয়ার উপহার দিলো ছাত্রদল নেতারা  হযরতপুরে চাচা হাজী দুঃখ মিয়া বিরুদ্ধে জাল দলিল ও জমি দখলের অভিযোগ তুলেছে ভাতিজা আলা. পুরান ঢাকার সফল সংগঠক মোস্তাকের জন্মদিন পালিত কেরানীগঞ্জে ডিবি পুলিশের অভিযানে ৫০ পিস ইয়াবাসহ একজন গ্রেপ্তার

তিন বোনের এক দিনে জন্ম, একসঙ্গে পরীক্ষা

অনলাইন ডেস্ক
  • আপডেট সময় : ০২:৪১:৩০ অপরাহ্ন, সোমবার, ২০ এপ্রিল ২০২৬
  • / 137
আজকের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার সালন্দর গ্রামের স্বপ্নীল বর্মন, স্বর্ণালী বর্মন ও সেজুতি বর্মনের একই দিনে জন্ম, একসঙ্গেই বেড়ে ওঠা। মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) শুরু হওয়া এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় তারা অংশ নিচ্ছে একইসঙ্গে।

২০০৯ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর জন্ম নেওয়া এই তিন বোনের শৈশব থেকে আজ পর্যন্ত পথচলা প্রায় একই সুতোয় গাঁথা। বাবা ঠান্ডারাম বর্মন ও মা ময়না রানী সেনের পাঁচ সন্তানের মধ্যে তারা মাঝের তিনজন। বড় বোন মৃদুলা বর্মন এবং ছোট ভাই প্রদ্যুৎ বর্মনকে নিয়ে তাদের পরিবার।

সম্প্রতি তাদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, পরীক্ষার আগ মুহূর্তে তিন বোনই গভীর মনোযোগে পড়াশোনায় ব্যস্ত। একই টেবিলে বসে, একই ছন্দে চলছে শেষ প্রস্তুতি। ছোটবেলা থেকেই তারা একসঙ্গে পড়াশোনা করে এসেছে। শুরুটা একটি কিন্ডারগার্টেন দিয়ে, পরে ভর্তি হয় স্থানীয় আরাজী কৃষ্ণপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। তখন শিক্ষক-সহপাঠীদের জন্য তাদের আলাদা করে চেনা ছিল বেশ কঠিন। ২০১৮ সালে স্বপ্নীল ও স্বর্ণালী ভর্তি হয় ঠাকুরগাঁও সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণিতে। কিছুদিন পর একই বিদ্যালয়ে যোগ দেয় সেজুতি। তিনজনই একই শিফটে পড়লেও শাখা ছিল আলাদা। স্বপ্নীল ও সেজুতি একই শাখায় থাকলেও স্বর্ণালীকে পড়তে হয়েছে অন্য শাখায়। সেই বিদ্যালয় থেকেই এবার তারা এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে।

তিনজনই বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্রী, তবে পছন্দের বিষয়ে পার্থক্য রয়েছে। স্বপ্নীলের পছন্দ জীববিজ্ঞান, পাশাপাশি বাংলা সাহিত্যেও তার আগ্রহ। স্বর্ণালীর ঝোঁক জীববিজ্ঞান ও রসায়নের দিকে, আর সেজুতি সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে জীববিজ্ঞানই।

 

পড়াশোনার পাশাপাশি তাদের ব্যক্তিগত পছন্দেও আছে মিল-অমিলের মিশেল। তিনজনেরই প্রিয় খাবার বিরিয়ানি, তবে অন্য খাবারে রুচি ভিন্ন। আগে একই ধরনের পোশাক কিনলেও এখন প্রত্যেকের জন্য আলাদা করে কিনতে হয়। থ্রি-পিস তাদের সবার পছন্দ, আর বিশেষ আয়োজনে শাড়িই প্রিয় পোশাক। তিন বোনই বই পড়তে ভালোবাসে, বিশেষ করে উপন্যাস ও সায়েন্স ফিকশন। গান শুনতে ও গাইতেও তারা সমান আগ্রহী। তারা বেতারের ঠাকুরগাঁও কেন্দ্রের তালিকাভুক্ত শিশুশিল্পী এবং দেশাত্মবোধক গান গাইতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে।

ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনজনের স্বপ্ন আলাদা। স্বপ্নীল চায় উচ্চশিক্ষা শেষে বিসিএস ক্যাডার কর্মকর্তা হতে। স্বর্ণালীর লক্ষ্য চিকিৎসক হওয়া, আর সেজুতি হতে চায় শিক্ষক।

তাদের দৈনন্দিন জীবনও যেন একসূত্রে বাধা, একই ঘরে থাকা, একসঙ্গে স্কুলে যাওয়া, খেলাধুলা করা। বন্ধুত্বও গভীর। মাঝে মধ্যে ছোটখাটো ঝগড়া হলেও তা দীর্ঘস্থায়ী হয় না, অল্প সময়েই মিটে যায় সব।

বিদ্যালয়ের শিক্ষক তাপস দেবনাথ জানান, একই ইউনিফর্মের কারণে অনেক সময় তাদের আলাদা করে চেনা কঠিন হয়ে যেত। এজন্য মাঝে মধ্যে আলাদা চিহ্ন ব্যবহার করতে হতো।

মা ময়না রানী সেন বলেন, বড় মেয়েও তখন ছোট। এরপর একসঙ্গে তিন মেয়ের জন্ম হয়। তাদের লালন-পালন করা সহজ ছিল না। কষ্ট যেমন আছে, তেমনি আনন্দও কম নয়। জন্মের ক্রমানুসারে তাদের মধ্যে বড়-ছোট নির্ধারণ করা হয়েছে। তারা ঝগড়া করে, আবার একে অন্যকে ছাড়া থাকতেও পারে না।

বাবা ঠান্ডারাম বর্মন বলেন, শুরুতে যমজ সন্তানের কথা জানা গেলেও অস্ত্রোপচারের পর তিনটি মেয়ে জন্ম নেয়। তখন চার সন্তানকে একসঙ্গে লালন–পালন নিয়ে দুশ্চিন্তা ছিল, কিন্তু এখন মেয়েদের ভালোবাসা ও সাফল্যে তিনি গর্বিত।

পরীক্ষার আগে তিন বোন একসঙ্গে সবার কাছে দোয়া চেয়েছে। তাদের প্রত্যাশা—ভালো ফল করে বাবা-মায়ের স্বপ্ন পূরণ করা। কথা শেষ করেই আবার বইয়ে মন দেয় তারা। সামনে তাদের নতুন পথচলার শুরু।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

তিন বোনের এক দিনে জন্ম, একসঙ্গে পরীক্ষা

আপডেট সময় : ০২:৪১:৩০ অপরাহ্ন, সোমবার, ২০ এপ্রিল ২০২৬

ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার সালন্দর গ্রামের স্বপ্নীল বর্মন, স্বর্ণালী বর্মন ও সেজুতি বর্মনের একই দিনে জন্ম, একসঙ্গেই বেড়ে ওঠা। মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) শুরু হওয়া এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় তারা অংশ নিচ্ছে একইসঙ্গে।

২০০৯ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর জন্ম নেওয়া এই তিন বোনের শৈশব থেকে আজ পর্যন্ত পথচলা প্রায় একই সুতোয় গাঁথা। বাবা ঠান্ডারাম বর্মন ও মা ময়না রানী সেনের পাঁচ সন্তানের মধ্যে তারা মাঝের তিনজন। বড় বোন মৃদুলা বর্মন এবং ছোট ভাই প্রদ্যুৎ বর্মনকে নিয়ে তাদের পরিবার।

সম্প্রতি তাদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, পরীক্ষার আগ মুহূর্তে তিন বোনই গভীর মনোযোগে পড়াশোনায় ব্যস্ত। একই টেবিলে বসে, একই ছন্দে চলছে শেষ প্রস্তুতি। ছোটবেলা থেকেই তারা একসঙ্গে পড়াশোনা করে এসেছে। শুরুটা একটি কিন্ডারগার্টেন দিয়ে, পরে ভর্তি হয় স্থানীয় আরাজী কৃষ্ণপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। তখন শিক্ষক-সহপাঠীদের জন্য তাদের আলাদা করে চেনা ছিল বেশ কঠিন। ২০১৮ সালে স্বপ্নীল ও স্বর্ণালী ভর্তি হয় ঠাকুরগাঁও সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণিতে। কিছুদিন পর একই বিদ্যালয়ে যোগ দেয় সেজুতি। তিনজনই একই শিফটে পড়লেও শাখা ছিল আলাদা। স্বপ্নীল ও সেজুতি একই শাখায় থাকলেও স্বর্ণালীকে পড়তে হয়েছে অন্য শাখায়। সেই বিদ্যালয় থেকেই এবার তারা এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে।

তিনজনই বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্রী, তবে পছন্দের বিষয়ে পার্থক্য রয়েছে। স্বপ্নীলের পছন্দ জীববিজ্ঞান, পাশাপাশি বাংলা সাহিত্যেও তার আগ্রহ। স্বর্ণালীর ঝোঁক জীববিজ্ঞান ও রসায়নের দিকে, আর সেজুতি সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে জীববিজ্ঞানই।

 

পড়াশোনার পাশাপাশি তাদের ব্যক্তিগত পছন্দেও আছে মিল-অমিলের মিশেল। তিনজনেরই প্রিয় খাবার বিরিয়ানি, তবে অন্য খাবারে রুচি ভিন্ন। আগে একই ধরনের পোশাক কিনলেও এখন প্রত্যেকের জন্য আলাদা করে কিনতে হয়। থ্রি-পিস তাদের সবার পছন্দ, আর বিশেষ আয়োজনে শাড়িই প্রিয় পোশাক। তিন বোনই বই পড়তে ভালোবাসে, বিশেষ করে উপন্যাস ও সায়েন্স ফিকশন। গান শুনতে ও গাইতেও তারা সমান আগ্রহী। তারা বেতারের ঠাকুরগাঁও কেন্দ্রের তালিকাভুক্ত শিশুশিল্পী এবং দেশাত্মবোধক গান গাইতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে।

ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনজনের স্বপ্ন আলাদা। স্বপ্নীল চায় উচ্চশিক্ষা শেষে বিসিএস ক্যাডার কর্মকর্তা হতে। স্বর্ণালীর লক্ষ্য চিকিৎসক হওয়া, আর সেজুতি হতে চায় শিক্ষক।

তাদের দৈনন্দিন জীবনও যেন একসূত্রে বাধা, একই ঘরে থাকা, একসঙ্গে স্কুলে যাওয়া, খেলাধুলা করা। বন্ধুত্বও গভীর। মাঝে মধ্যে ছোটখাটো ঝগড়া হলেও তা দীর্ঘস্থায়ী হয় না, অল্প সময়েই মিটে যায় সব।

বিদ্যালয়ের শিক্ষক তাপস দেবনাথ জানান, একই ইউনিফর্মের কারণে অনেক সময় তাদের আলাদা করে চেনা কঠিন হয়ে যেত। এজন্য মাঝে মধ্যে আলাদা চিহ্ন ব্যবহার করতে হতো।

মা ময়না রানী সেন বলেন, বড় মেয়েও তখন ছোট। এরপর একসঙ্গে তিন মেয়ের জন্ম হয়। তাদের লালন-পালন করা সহজ ছিল না। কষ্ট যেমন আছে, তেমনি আনন্দও কম নয়। জন্মের ক্রমানুসারে তাদের মধ্যে বড়-ছোট নির্ধারণ করা হয়েছে। তারা ঝগড়া করে, আবার একে অন্যকে ছাড়া থাকতেও পারে না।

বাবা ঠান্ডারাম বর্মন বলেন, শুরুতে যমজ সন্তানের কথা জানা গেলেও অস্ত্রোপচারের পর তিনটি মেয়ে জন্ম নেয়। তখন চার সন্তানকে একসঙ্গে লালন–পালন নিয়ে দুশ্চিন্তা ছিল, কিন্তু এখন মেয়েদের ভালোবাসা ও সাফল্যে তিনি গর্বিত।

পরীক্ষার আগে তিন বোন একসঙ্গে সবার কাছে দোয়া চেয়েছে। তাদের প্রত্যাশা—ভালো ফল করে বাবা-মায়ের স্বপ্ন পূরণ করা। কথা শেষ করেই আবার বইয়ে মন দেয় তারা। সামনে তাদের নতুন পথচলার শুরু।