বজ্রপাতে ১৮ দিনে ১৫ জনের মৃত্যু, একদিনেই প্রাণ হারালেন ১২ জন
- আপডেট সময় : ০৪:০৪:৫৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৯ এপ্রিল ২০২৬
- / 21
দেশে মৌসুমের শুরুতেই বজ্রপাতে বড় ধরনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। চলতি এপ্রিল মাসের প্রথম ১৮ দিনেই বজ্রপাতে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ১৫ জন। এর মধ্যে গত শনিবার (১৮ এপ্রিল) এক দিনেই দেশের ছয়টি জেলায় ১২ জন নিহত হয়েছেন, যা চলতি মৌসুমে এক দিনে সর্বোচ্চ মৃত্যুর রেকর্ড। সামনে কালবৈশাখি মৌসুম ঘনিয়ে আসায় ঝুঁকি আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশেষ করে মে-জুন মাসে সিলেটের হাওরাঞ্চলসহ গ্রামীণ এলাকায় বজ্রপাতের পরিমাণ বাড়তে পারে। সচেতনতা ও সতর্কতা জোরদার না হলে এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রাণহানির সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আবহাওয়াবিদদের মতে, বায়ুমণ্ডলে উষ্ণ ও আর্দ্র বাতাসের সঙ্গে ওপরের স্তরের শীতল বাতাসের তীব্র সংঘর্ষ হলে আকাশে বিশালাকৃতির ‘কিউমুলোনিম্বাস’ (অত্যন্ত ঘন, উল্লম্বভাবে বিস্তৃত এবং শক্তিশালী বজ্রঝড় সৃষ্টিকারী মেঘ) মেঘ তৈরি হয়। এই মেঘের ভেতরে জলকণা ও বরফকণার ঘর্ষণে বিপুল পরিমাণ বৈদ্যুতিক আধান তৈরি হয়। এই চার্জের ভারসাম্যহীনতা বেশি হলে বিদ্যুৎ চমকায়, আর তা মাটিতে আঘাত করলে সেটিই বজ্রপাত।
সাম্প্রতিক সময়ে বজ্রপাতে বড় ধরনের প্রাণহানির ঘটনায় উদ্বেগ বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বজ্রপাত হঠাৎ ঘটলেও এর আগে প্রকৃতিতে কিছু স্পষ্ট লক্ষণ দেখা যায়। এসব লক্ষণ বুঝতে পারলে আগেভাগেই নিরাপদ স্থানে সরে গিয়ে প্রাণহানি এড়ানো সম্ভব
মার্কিন মহাকাশ সংস্থা নাসার তথ্য অনুযায়ী, ভৌগোলিক অবস্থান ও হাওরাঞ্চলের বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কারণে মার্চ থেকে মে মাসের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বজ্রপাত ঘটে বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সুনামগঞ্জ এলাকায়। বিশেষ করে সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ উপজেলাকে বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। মেঘালয় পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থান এবং বিশাল জলরাশি বেষ্টিত হাওর হওয়ার কারণে এখানকার জলীয়বাষ্প দ্রুত ওপরে উঠে বজ্রমেঘ তৈরি করে, যা এলাকাটিকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে পরিণত করেছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশের বজ্রপাত প্রবণ এলাকাগুলোকে তিনটি প্রধান অঞ্চলে ভাগ করা হয়েছে। উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সুনামগঞ্জ, সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জ জেলাগুলো উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ। অন্যদিকে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের রাজশাহী, নবাবগঞ্জ, পাবনা, দিনাজপুর, নওগাঁ ও সিরাজগঞ্জ এলাকায় বজ্রপাতের তীব্রতা বেশি।
তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের মধ্যাঞ্চলেও বজ্রপাত বৃদ্ধির প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ফলে ঢাকা, নরসিংদী, শেরপুর ও ময়মনসিংহ জেলাগুলোও এখন উচ্চ ঝুঁকির তালিকায় রয়েছে। এর বিপরীতে দক্ষিণবঙ্গের জেলাগুলোতে বজ্রপাতের প্রকোপ তুলনামূলক কম।
১৮ এপ্রিল একদিনেই নিভেছে ১২ জীবন প্রদীপ
চলতি এপ্রিল মাসের ১৮ তারিখে (শনিবার) ভয়াবহ বজ্রপাতে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সুনামগঞ্জ জেলা। এদিন জেলার পৃথক চারটি উপজেলায় পাঁচ জন কৃষক নিহত হন।নিহতদের মধ্যে রয়েছেন জামালগঞ্জের নাজমুল হোসেন, ধর্মপাশার কলেজছাত্র হাবিবুর রহমান ও রহমত উল্লাহ, তাহিরপুরের আবুল কালাম এবং দিরাইয়ের লিটন মিয়া।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে মোট বজ্রপাতের প্রায় ৩৮ শতাংশ ঘটে মার্চ, এপ্রিল ও মে মাসে। অন্যদিকে জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়ে ঘটে প্রায় ৫১-৫২ শতাংশ বজ্রপাত। অক্টোবর ও নভেম্বরে এ হার প্রায় ৮ শতাংশ এবং ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারিতে মাত্র ২ শতাংশ
এছাড়া রংপুরের মিঠাপুকুরে মাছ ধরার সময় দুই জন, ময়মনসিংহের গৌরীপুর ও গফরগাঁওয়ে দুই জন এবং নেত্রকোনা, হবিগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ ও লালমনিরহাটে আরও চার জন কৃষক প্রাণ হারান। নিহতদের প্রায় সবাই ছিলেন শ্রমজীবী কৃষক। তারা খোলা মাঠে বোরো ধান কাটার সময় কিংবা গরু নিয়ে বাড়ি ফেরার পথে এই আকস্মিক দুর্যোগের শিকার হন।
এর আগে, গত ১ এপ্রিল সিলেটের গোয়াইনঘাটে আরও একজনের মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত অন্তত ১৩ জন গুরুতর আহত হয়ে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
দূর থেকে কালো মেঘ দেখলেই বুঝবেন ঝুঁকি বাড়ছে : আবহাওয়াবিদ শাহীনুল ইসলাম
সাম্প্রতিক সময়ে বজ্রপাতে বড় ধরনের প্রাণহানির ঘটনায় উদ্বেগ বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বজ্রপাত হঠাৎ ঘটলেও এর আগে প্রকৃতিতে কিছু স্পষ্ট লক্ষণ দেখা যায়। এসব লক্ষণ বুঝতে পারলে আগেভাগেই নিরাপদ স্থানে সরে গিয়ে প্রাণহানি এড়ানো সম্ভব।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ মো. শাহীনুল ইসলাম বলেন, দূর থেকে কালো কুচকুচে ও গম্বুজাকৃতির মেঘ দ্রুত এগিয়ে আসা বজ্রপাতের অন্যতম প্রধান লক্ষণ। অনেক সময় গুমোট গরমের পর হঠাৎ ঠান্ডা বাতাস বইতে শুরু করে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ চমকানোর পর খুব অল্প সময়ের মধ্যে বজ্রধ্বনি শোনা গেলে সেটিও ঝুঁকি ঘনিয়ে আসার ইঙ্গিত।
তিনি জানান, বজ্রপাতের আগে আবহাওয়া অধিদপ্তর নির্দিষ্ট এলাকাকে লক্ষ্য করে সতর্কবার্তা জারি করে। তবে এসব সতর্কবার্তা অনেক সময় গ্রামাঞ্চল বা হাওর অঞ্চলের মানুষের কাছে পৌঁছায় না। একইসঙ্গে বজ্রপাতে কেউ আহত হলে তাকে দ্রুত কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাস (সিপিআর) দিতে হবে এবং দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। বজ্রপাতে আহত ব্যক্তির শরীরে কোনো বিদ্যুৎ প্রবাহ থাকে না, তাই তাকে স্পর্শ করতে ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই।
দূর থেকে কালো কুচকুচে ও গম্বুজাকৃতির মেঘ দ্রুত এগিয়ে আসা বজ্রপাতের অন্যতম প্রধান লক্ষণ। অনেক সময় গুমোট গরমের পর হঠাৎ ঠান্ডা বাতাস বইতে শুরু করে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ চমকানোর পর খুব অল্প সময়ের মধ্যে বজ্রধ্বনি শোনা গেলে সেটিও ঝুঁকি ঘনিয়ে আসার ইঙ্গিত
মো. শাহীনুল ইসলাম, আবহাওয়াবিদ, বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর
শাহীনুল ইসলাম বলেন, এ সময় কৃষকরা প্রায়ই খোলা মাঠে কাজ করেন। দূর থেকে কালো মেঘ দেখলেও তাদের পক্ষে দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়া অনেক সময় সম্ভব হয় না, ফলে ঝুঁকি বাড়ে। বজ্রপাত সাধারণত উঁচু স্থানে আঘাত করে। এ কারণে গ্রামীণ এলাকায় তালগাছ লাগানোর পরামর্শ দেওয়া হয়। তালগাছ বজ্রপাত প্রতিরোধ না করলেও উঁচু হওয়ায় বজ্রপাতকে নিজের দিকে আকর্ষণ করে, ফলে আশপাশের মানুষ কিছুটা নিরাপদ থাকতে পারেন। তবে হাওরাঞ্চলে গাছপালা কম থাকায় অনেক সময় কৃষকরাই সবচেয়ে উঁচু বস্তুতে পরিণত হন, যা তাদের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেয়। তাই এমন পরিস্থিতিতে খোলা মাঠ, জলাশয় বা বড় গাছের নিচে অবস্থান না করে দ্রুত পাকা দালানে আশ্রয় নেওয়া জরুরি।
মার্চ থেকে মে মাসে বজ্রপাতে মৃত্যুঝুঁকি বেশি : জ্যেষ্ঠ আবহাওয়াবিদ
দেশে বজ্রপাতের ঝুঁকি মূলত মার্চ থেকে মে মাসে বেশি প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের জ্যেষ্ঠ আবহাওয়াবিদ ড. আবুল কালাম মল্লিক।
‘শুনলে বজ্রধ্বনি, ঘরে যাব তখনই’ নীতি অনুসরণ করতে হবে। অর্থাৎ বজ্রধ্বনি শোনামাত্রই খোলা জায়গা ছেড়ে দ্রুত ঘরে আশ্রয় নিতে হবে। আর ঘরে যাওয়ার পর অন্তত ৩০ মিনিট অপেক্ষা করতে হবে। এ সময়ের মধ্যে আবার বজ্রধ্বনি শোনা গেলে শেষবারের শব্দ শোনার পর থেকে নতুন করে ৩০ মিনিট গণনা করতে হবে
ড. আবুল কালাম মল্লিক, জ্যেষ্ঠ আবহাওয়াবিদ, বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর
তিনি বলেন, বজ্রপাত সারা বছরই হয়, তবে সবচেয়ে বেশি মানুষ মারা যায় মার্চ, এপ্রিল ও মে মাসে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে মোট বজ্রপাতের প্রায় ৩৮ শতাংশ ঘটে মার্চ, এপ্রিল ও মে মাসে। অন্যদিকে জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়ে ঘটে প্রায় ৫১ শতাংশ বজ্রপাত। অক্টোবর ও নভেম্বরে এ হার প্রায় ৮ শতাংশ এবং ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারিতে মাত্র ২ শতাংশ।
তিনি বলেন, সংখ্যায় কম হলেও মার্চ থেকে মে মাসের বজ্রপাত সবচেয়ে বেশি শক্তিশালী ও প্রাণঘাতী। এই সময়ে মেঘ থেকে সরাসরি ভূমিতে বজ্রপাতের হার বেশি থাকে এবং এমন বজ্রপাতেই প্রায় ৯৯ শতাংশ মৃত্যুর ঘটনা ঘটে।
আবহাওয়া অধিদপ্তর বজ্রপাতের সম্ভাবনা থাকলে ২ থেকে ৪ ঘণ্টা আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সতর্কবার্তা দেয়। কিন্তু শুধু সতর্কবার্তা দিয়ে প্রাণহানি ঠেকানো সম্ভব হচ্ছে না। কৃষক, জেলে, শ্রমজীবী মানুষ ও শিক্ষার্থীরা এ সময় সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে।
বজ্রপাত থেকে বাঁচতে সবচেয়ে কার্যকর উপায় হিসেবে তিনি বলেন— ‘শুনলে বজ্রধ্বনি, ঘরে যাব তখনই’ নীতি অনুসরণ করতে হবে। অর্থাৎ বজ্রধ্বনি শোনামাত্রই খোলা জায়গা ছেড়ে দ্রুত ঘরে আশ্রয় নিতে হবে। আর ঘরে যাওয়ার পর অন্তত ৩০ মিনিট অপেক্ষা করতে হবে। এ সময়ের মধ্যে আবার বজ্রধ্বনি শোনা গেলে শেষবারের শব্দ শোনার পর থেকে নতুন করে ৩০ মিনিট গণনা করতে হবে।



















