গাছ তুমি কার? আমলাতান্ত্রিক সমন্বয়হীনতার জটলায় পড়ে জয়নুল আবেদীন উদ্যানে নষ্ট হচ্ছে তিন গাছ
- আপডেট সময় : ০৭:৫৩:৩৮ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬
- / 30
নিজস্ব প্রতিবেদক, ময়মনসিংহ:
গত বর্ষার ঝড়-তুফানে উপড়ে পড়ার পর থেকে ময়মনসিংহ নগরীর ঐতিহ্যবাহী জয়নুল আবেদীন পার্কের এক কোণে পড়ে আছে তিনটি বিশাল গাছ। কয়েক মাস ধরে অযত্ন, অবহেলা আর ধুলোবালির মধ্যে পড়ে থেকে গাছগুলো এখন যেন বেওয়ারিশ লাশে পরিণত হয়েছে। এগুলো সরানো বা সংরক্ষণের দায়িত্ব নিয়ে প্রশাসনের মধ্যে তৈরি হয়েছে এক অদ্ভুত আমলাতান্ত্রিক জটলা।
নগরবাসীর বিনোদন ও স্বস্তির অন্যতম স্থান হিসেবে পরিচিত এই উদ্যানের এমন চিত্র অনেকের মধ্যেই হতাশা তৈরি করছে। গাছগুলো কার এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতার চিত্র।
ময়মনসিংহ সিটি কর্পোরেশন (মসিক) নগরজুড়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম চালিয়ে প্রশংসা পেলেও এই তিনটি গাছ সরানোর বিষয়ে তারা কার্যত অসহায়। পার্কের দায়িত্বপ্রাপ্ত মসিকের জুনিয়র এক্সিকিউটিভ অফিসার মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, “পার্কের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব আমাদের থাকলেও মালিকানা জটিলতার কারণে গাছগুলো সরাতে পারছি না। এগুলোর মালিক জেলা প্রশাসন। ইতিপূর্বেও গাছ সরাতে গেলে এসিল্যান্ড অফিস থেকে বাধা দেওয়া হয়েছে। তবে জেলা প্রশাসন নির্দেশ দিলে আমরা দ্রুত সরিয়ে ফেলতে পারব।”
অন্যদিকে বন বিভাগও এর দায় স্বীকার করেনি। বিভাগীয় বন কর্মকর্তা কাজী মো. নূরুল করিম জানান, “এই গাছগুলো বন বিভাগের আওতাধীন নয়।”আমাদের আসলে এই গাছের ব্যাপারে দ্বায়ভার নাই।
প্রশাসনিক সূত্রে জানা যায়, উদ্যানের জমি ১ নম্বর খতিয়ানের আওতাধীন হওয়ায় এর মালিক জেলা প্রশাসন (রাজস্ব শাখা)। সে হিসেবে গাছগুলোর মালিকানাও তাদের ওপর বর্তায়। তবে কর্তৃত্ব থাকা সত্ত্বেও দায়িত্ব পালনে দীর্ঘদিন কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ নেয়নি জেলা প্রশাসন।
এ বিষয়ে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) আজিম উদ্দিন বলেন, “বিষয়টি সম্পর্কে সদ্য অবগত হয়েছি। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে এসিল্যান্ড সদরকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দ্রুত মিটিংয়ের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।”
তবে দীর্ঘ সময় ধরে গাছগুলো পড়ে থাকলেও কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে প্রশাসনের দায়িত্ববোধ নিয়ে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের গাছ সংরক্ষণ বা নিলামের মাধ্যমে সরকার উল্লেখযোগ্য রাজস্ব আয় করতে পারে। কিন্তু সমন্বয়হীনতার কারণে একদিকে যেমন সরকারি সম্পদের অপচয় হচ্ছে, অন্যদিকে নাগরিকরা হারাচ্ছেন তাদের প্রিয় উদ্যানের সৌন্দর্য।
পরিবেশ কর্মী ইফতেখারুল আলম বলেন সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—কোনো ব্যক্তি বা সংগঠন যদি স্বেচ্ছায় গাছগুলো সরাতে চায়, তবে আইনি জটিলতায় পড়ার আশঙ্কা থাকে। ফলে প্রশাসন নিজেও উদ্যোগ নিচ্ছে না, আবার অন্য কাউকেও করতে দিচ্ছে না।
একটি গাছ জীবদ্দশায় যেমন মানুষের উপকারে আসে, তেমনি মৃত্যুর পরও তা সম্পদ হিসেবে কাজে লাগতে পারে। কিন্তু জয়নুল আবেদীন পার্কের এই তিনটি গাছ এখন আমলাতান্ত্রিক জটলায় পড়ে ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
গাছগুলো হয়তো একসময় মাটির সঙ্গে মিশে যাবে, কিন্তু রেখে যাবে একটি প্রশ্ন—“গাছ তুমি কার?” আর সেই প্রশ্নই যেন তুলে ধরছে প্রশাসনিক উদাসীনতা ও সমন্বয়হীনতার বাস্তব চিত্র।










