পবিত্র রজনী শবে-বরাত
- আপডেট সময় : ০৪:৪২:৩২ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৫
- / 215
শবে বরাত পুণ্যময় রজনী। এই রাতের তাৎপর্য ইসলামে স্বীকৃত। আজ শুক্রবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) রাতে সারাদেশে যথাযোগ্য ধর্মীয় মর্যাদায় পবিত্র শবে-বরাত পালিত হচ্ছে।হিজরি সালের শাবান মাসের ১৪ তারিখ দিবাগত রাতটি মুসলমানরা শবে-বরাত বা সৌভাগ্যের রজনী হিসেবে পালন করে থাকেন। এ রাতটি ‘লাইলাতুল বরাত’ হিসেবেও পরিচিত। পবিত্র এই রাতে আল্লাহর অশেষ রহমত ও নিয়ামত বর্ষিত হয় এই মহিমাময় রাতে ইবাদত-বন্দেগীর মাধ্যমে আমরা মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভ করতে পারি। অর্জন করতে পারি তাঁর অসীম রহমত, বরকত, নাজাত ও মাগফিরাত। তবে একে ঘিরে গড়ে উঠেছে কিছু কুসংস্কারও। মূলত শবে বরাত ইবাদতের রাত। সমাজের একটা শ্রেণি আছে, যারা এই রাতে মাথায় টুপি ও হাতে তসবিহ নিয়ে আতশবাজি ছোড়ে এবং পটকা ফোটায়। অথচ এর মাধ্যমে সমাজে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। বৃদ্ধ ও শিশুরা ভয়ে বের হতে পারে না। এর কারণে যেখানে-সেখানে অগ্নিকাণ্ডও ঘটতে পারে। শবে বরাতের সঙ্গে এ ধরনের কাজের সম্পর্ক দূরে থাক, ইসলামের সঙ্গে এসব কাজের দূরতম সম্পর্কও নেই। কোনো কোনো অঞ্চলে এ রাতে বাড়িঘর, মসজিদ ও ধর্মীয় স্থাপনায় আলোকসজ্জা করা হয়। এর মাধ্যমে একটি উৎসবের আমেজ তৈরি করা হয়। অথচ এর সঙ্গে শবে বরাতের কোনো সম্পর্ক নেই; বরং এসব কাজ অপচয়ের অন্তর্ভুক্ত, যা ইসলামে নিরুৎসাহিত করা হয়। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা অপচয় কোরো না, নিশ্চয়ই অপচয়কারী শয়তানের ভাই।’ (সুরা বনি ইসরাইল) আমরা জেনে না-জেনে নানা গুনাহ করে ফেলি। শবে বরাতের পুণ্যময় রাতে আল্লাহ তাআলা সব গুনাহ ক্ষমা করে দেন। তবে কিছু গুনাহ আল্লাহ তাআলার কাছে এতই জঘন্য যে এমন মহিমান্বিত রাতেও সেসব ক্ষমা করেন না। যেমন—হিংসা, জাদুটোনা, গণকে বিশ্বাস, মা-বাবার অবাধ্যতা, ব্যভিচার ইত্যাদি। লোকমুখে একটি বানোয়াট কথা প্রচলিত আছে, যা রাসুল (সা.)-এর হাদিস বলে চালিয়ে দেওয়া হয়। তা হলো, ‘শবে বরাতে হালুয়া-রুটি বানালে আরশের নিচে ছায়া পাওয়া যাবে।’ তবে হাদিসের সঙ্গে এর দূরতম সম্পর্ক নেই। এটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও বানোয়াট কথা। কোনো জাল হাদিসেও এমন কথা পাওয়া যায় না। শবে বরাতের নামাজশবে বরাতের নামাজ নামে কোনো বিশেষ নামাজ কোরআন-হাদিস থেকে প্রমাণিত নয়। সুতরাং এ রাতে বেশি বেশি নফল নামাজ ও ইবাদতের কথা থাকলেও শবে বরাতের বিশেষ নিয়মের, সুনির্দিষ্ট রাকাতের এবং বিশেষ নিয়তের নামাজ আদায় করা অনুচিত। হজরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা বর্ণনা করেন, একবার রাসুল (সা) রাতে নামাজে দাঁড়ান এবং এতো দীর্ঘ সেজদা করেন যে আমার ধারণা হলো, তিনি হয়ত মৃত্যুবরণ করেছেন। আমি তখন উঠে তার বৃদ্ধাঙ্গুলি নাড়া দিলাম। তার বৃদ্ধাঙ্গুলি নড়ল। যখন তিনি সেজদা থেকে উঠলেন এবং নামাজ শেষ করলেন, তখন আমাকে লক্ষ্য করে বললেন, ‘হে আয়েশা, তোমার কি এই আশঙ্কা হয়েছে যে, আল্লাহর রাসুল তোমার হক নষ্ট করবেন?’ আমি উত্তরে বললাম, ‘না, হে আল্লাহর রাসুল। আপনার দীর্ঘ সেজদা থেকে আমার এই আশঙ্কা হয়েছিল যে আপনি মৃত্যুবরণ করেছেন।’ তখন নবী (সা.) জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তুমি কি জানো, এটা কোন রাত?’ আমি বললাম, ‘আল্লাহ ও তাঁর রাসুলই ভালো জানেন।’ রাসুলুল্লাহ (সা.) তখন ইরশাদ করলেন, ‘এটা হলো অর্ধ শাবানের রাত (শবে বরাত)। আল্লাহ তাআলা অর্ধ-শাবানের রাতে তার বান্দার প্রতি মনোযোগ দেন এবং ক্ষমাপ্রার্থনাকারীদের ক্ষমা করেন এবং অনুগ্রহপ্রার্থীদের অনুগ্রহ করেন আর বিদ্বেষ পোষণকারীদের ছেড়ে দেন তাদের অবস্থাতেই।’ (শুআবুল ইমান, বায়হাকি: ৩ / ৩৮২-৩৮৩; তাবারানি: ১৯৪)অন্য হাদিসে হজরত মুয়াজ ইবনে জাবাল (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুল (সা.) এরশাদ করেছেন, ‘অর্ধ শাবানের রাতে (শবে বরাতে) আল্লাহ তাআলা তার সৃষ্টিজগতের প্রতি মনোযোগ দেন এবং মুশরিক ও বিদ্বেষ ভাবাপন্ন ব্যক্তি ছাড়া সবাইকে ক্ষমা করে দেন।’ (সহিহ ইবনে হিব্বান, হাদিস: ৫৬৬৫; মুসনাদুল বাজ্জার, হাদিস: ২৭৫৪, আল মুজামুল আওসাত, হাদিস: ৬৭৭৬; আল মুজামুল কাবির, হাদিস: ২১৫; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ১৩৯০; মুসন্নাফে ইবনে আবি শাইবা, হাদিস: ৩০৪৭৯, শুয়াবুল ঈমান, হাদিস: ৬২০)এ দিন রাতে ইবাদত করে পরদিন রোজা রাখার কথা বলা হয়েছে হাদিসে। এ বিষয়ে হজরত আলি (রা.) থেকে একটি হাদিস বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘১৫ শাবানের রাত (১৪ তারিখ দিবাগত রাত) যখন আসে তখন তোমরা এ রাতটি ইবাদত-বন্দেগিতে কাটাও এবং দিনের বেলা রোজা রাখো।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস: ১৩৮৮) শবে বরাত সম্পর্কে হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) বলেন, ‘৫টি রাত এমন আছে, যে রাতের দোয়া ফিরিয়ে দেওয়া হয় না। জুমার রাত, রজবের প্রথম রাত, শাবানের ১৪ তারিখ রাত, দুই ঈদের রাত।’ (মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক, হাদিস: ৭৯২৭)ওমর ইবনে আবদুল আজিজ আদি ইবনে আরতাতের উদ্দেশ্যে লেখেন, ‘বছরের চারটি রাত তুমি অবশ্যই লক্ষ রাখবে। কেননা সেসব রাতে আল্লাহর রহমত বর্ষিত হয়—রজবের প্রথম রাত, শাবানের ১৪ তারিখ রাত, ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার রাত।’ (আত-তালখিসুল হাবির, ইবনে হাজার: ২ / ১৯১)




















