শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরানো—চেষ্টা, চুক্তি ও বাস্তবতা
- আপডেট সময় : ০৯:১২:৫৪ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১ ডিসেম্বর ২০২৫
- / 121
বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করেছে। পাশাপাশি দুর্নীতির তিন মামলায় ঢাকার আদালত তাকে ৭ বছর করে কারাদণ্ড দিয়েছে। একই মামলায় তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় ও মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুলকেও পাঁচ বছর করে দণ্ড দেওয়া হয়। তবে রায় কার্যকর করতে হলে তাকে দেশে ফিরিয়ে আনা—এটাই এখন সবচেয়ে কঠিন প্রশ্ন।
ফেরানো কেন কঠিন বলে মনে করা হচ্ছে?
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে আনা বাস্তবে প্রায় অসম্ভব। তাদের যুক্তি—
ভারত চাইলে ফেরত সম্ভব—তবে বাস্তবতা ভিন্ন
বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ আহমেদ বলেন, ভারত বর্তমান সরকারকে স্বীকৃতি দেয়নি, ফলে তাদের সহযোগিতা অসম্ভব। এছাড়া কেউ আশ্রয় দেওয়ার পরে ফিরিয়ে দেওয়ার নজির খুবই বিরল।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত কাউকে ফেরত পাঠাতে অনীহা
জেড আই খান পান্না সহ একাধিক আইনজীবী বলেন, যেসব দেশে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয় না বা মানবাধিকারের প্রশ্ন জোরালো—তারা সাধারণত মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত কাউকে ফেরত দেয় না।
২০১৩ সালের প্রত্যর্পণ চুক্তির সীমাবদ্ধতা
এই চুক্তিতে ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ মামলার ক্ষেত্রে প্রত্যর্পণ না করার সুযোগ আছে। ভারত বলতেই পারে বিচার রাজনৈতিক, সুষ্ঠু হয়নি, ফলে ফিরিয়ে দেয়ার বাধ্যবাধকতা নেই।
আওয়ামী লীগ–ভারত সম্পর্ক অতীতের কৌশলগত বাস্তবতা
শেখ হাসিনার পরিবারের সঙ্গে ভারতের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি, নিরাপত্তা সহযোগিতা—এসব বিষয়ক প্রেক্ষাপটও ভারতকে সতর্ক করে রেখেছে।
তবুও ফেরানো সম্ভব—যদি দুই পথ কার্যকর হয়
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম দুইটি সম্ভাব্য পথ উল্লেখ করেছেন—
প্রত্যর্পণ চুক্তি (Extradition Treaty–2013) ব্যবহার করে
বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতের কাছে অনুরোধ করবে এবং ভারত গ্রহণ করলে ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
ইন্টারপোলের রেড নোটিশের মাধ্যমে গ্রেফতার ও প্রত্যাবর্তন
পুলিশ সদর দপ্তর জানিয়েছে—রেড নোটিশ জারির প্রক্রিয়া চলছে।
তবে এসবই প্রক্রিয়াগত সম্ভাবনা; কার্যকর হবে কিনা শেষ কথা বলবে ভারত।
আন্তর্জাতিক আদালত (ICC) কি সমাধান?
আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন—আইসিসির মাধ্যমে ফেরানো প্রায় অসম্ভব। কারণ—
আইসিসি মৃত্যুদণ্ড সমর্থন করে না।
আন্তর্জাতিক বিচার মানলেও আইসিসি সদস্য না হওয়া দেশগুলো বাধ্য নয়।
ভারত রোম স্ট্যাটুটে স্বাক্ষর করেনি—তাই আইসিসির অনুরোধ মানার বাধ্যবাধকতা নেই।
ভারতের অবস্থান এখনো পর্যবেক্ষণমূলক
বাংলাদেশ নোট ভারবাল পাঠিয়েছে—কিন্তু ভারত এখনো আনুষ্ঠানিক জবাব দেয়নি। দিল্লি জানিয়েছে—
রায় পর্যবেক্ষণে রয়েছে, বাংলাদেশের সব পক্ষের সঙ্গে গঠনমূলকভাবে যুক্ত থাকতে চায় তারা।
এটি স্পষ্ট—ভারত দ্রুত কোনো সিদ্ধান্ত নিচ্ছে না; সময় নিচ্ছে এবং রাজনৈতিক–কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা করছে।
সংক্ষেপে সারমর্ম
বিষয় অবস্থা
ভারত চাইলে প্রত্যর্পণ সম্ভব ✔ কিন্তু বাস্তবে অনিশ্চিত
মৃত্যুদণ্ড ফেরানোর পথে বাধা ✔ মানবাধিকার ও আইনি জটিলতা
ইন্টারপোলের পথ চলমান, তবে ভারতীয় অনুমতি গুরুত্বপূর্ণ
আইসিসির মাধ্যমে ফেরানো প্রায় অসম্ভব
চূড়ান্ত নির্ভরতা ভারতের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর
🔻 উপসংহার
প্রক্রিয়া আছে, চেষ্টা চলছে—কিন্তু আন্তর্জাতিক কূটনীতি, ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্ক, মৃত্যুদণ্ড এবং বিচার নিয়ে প্রশ্ন—সব মিলিয়ে শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরানো বর্তমানে অত্যন্ত জটিল ও অনিশ্চিত।
রাষ্ট্র চাইলে পদক্ষেপ নিতে পারে, তবে ফলাফল পুরোপুরি ভারতের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের উপর নির্ভরশীল।




















