ঢাকা ১১:১৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬, ১৫ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
মে ও জুন মাসে ঢাকা জেলার শ্রেষ্ঠ গোয়েন্দা কর্মকর্তা নির্বাচিত এসআই এনামুল হক উবহাটা ইউনিয়নের মানুষের সেবায় কাজ করতে চান সম্ভাব্য চেয়ারম্যান প্রার্থী রিপন তরফদার মোবাইল চুরির অপবাদে নাতিকে মারধর, বাধা দিতে গিয়ে দাদা খুন: দুই অভিযুক্ত গ্রেফতার ময়মনসিংহে ডিবি-থানা পুলিশের যৌথ অভিযানে আরও ৯ ছিনতাইকারী গ্রেফতার ময়মনসিংহে স্বামীকে হত্যার দায়ে স্ত্রীর যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ময়মনসিংহে নির্মাণাধীন ভবনে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে ২ শ্রমিকের মৃত্যু গুলশান থেকে লতিফ সিদ্দিকী গ্রেপ্তার ময়মনসিংহে অন্যরকম হাট, যেখানে বিক্রি হয় মানুষ ময়মনসিংহ মেডিকেলে ডেঙ্গুতে কিশোরের মৃত্যু, হাসপাতালে ভর্তি ৪৪ রোগী হবিগঞ্জে বিএনপি-এনসিপির পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি ঘিরে ১৪৪ ধারা জারি

২৫ বছরের গবেষণায় বাকৃবির সাফল্য, দেশে প্রথম দেশীয় জৈব ছত্রাকনাশক উদ্ভাবন

অনলাইন ডেস্ক
  • আপডেট সময় : ০২:২৮:৫২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৪ জুলাই ২০২৬
  • / 20
আজকের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

নিজস্ব প্রতিবেদক, ময়মনসিংহ:
দীর্ঘ ২৫ বছরের নিরবচ্ছিন্ন গবেষণার পর বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো দেশীয় প্রযুক্তিতে ট্রাইকোডার্মাভিত্তিক জৈব ছত্রাকনাশক উদ্ভাবন করেছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) একদল গবেষক।

দেশীয় উৎসের ট্রাইকোডার্মা অ্যাসপেরেলাম ব্যবহার করে তৈরি এ বায়োফরমুলেশন একই সঙ্গে জৈব ছত্রাকনাশক ও জৈব সার হিসেবে কাজ করে। প্রতি গ্রাম পণ্যে ন্যূনতম ২০ লাখ জীবন্ত ট্রাইকোডার্মা স্পোর রয়েছে। গবেষকদের দাবি, এটি বিভিন্ন ফসলের রোগ দমন, ফলন বৃদ্ধি, মাটির স্বাস্থ্য উন্নয়ন এবং মৎস্য খাতে পানির গুণগত মান উন্নত করতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

প্রধান গবেষক ও বাকৃবির উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শাহজাহান মঞ্জিল বলেন, দেশে ব্যবহৃত মোট বালাইনাশকের প্রায় ৪৫ থেকে ৪৬ শতাংশই রাসায়নিক ছত্রাকনাশক। এসব রাসায়নিকের অতিরিক্ত ব্যবহারে ক্ষতিকর ছত্রাকের পাশাপাশি মাটির উপকারী অণুজীবও ধ্বংস হয়। ফলে পরিবেশ, মাটির স্বাস্থ্য ও জনস্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

এ বাস্তবতায় পরিবেশবান্ধব ও টেকসই বিকল্প হিসেবে উদ্ভাবন করা হয়েছে ‘পিজি-ট্রাইকোডার্মা’, যা একই সঙ্গে জৈব ছত্রাকনাশক ও জৈব সার হিসেবে কাজ করে।

গবেষকরা জানান, গবেষণার শুরুতে দেশের বিভিন্ন কৃষি-পরিবেশ অঞ্চল থেকে হাজার হাজার মাটি ও রাইজোস্ফিয়ার নমুনা সংগ্রহ করা হয়। সেখান থেকে শতাধিক ট্রাইকোডার্মা ছত্রাক পৃথক করে দীর্ঘদিন কার্যকারিতা যাচাই-বাছাই করা হয়। পরে বাংলাদেশের জলবায়ুর সঙ্গে সবচেয়ে বেশি অভিযোজিত ও কার্যকর ট্রাইকোডার্মা অ্যাসপেরেলাম নির্বাচন করে এর ভিত্তিতে বায়োফরমুলেশন তৈরি করা হয়।

গবেষণায় দেখা গেছে, টমেটো, আলু, বেগুন, ঢেঁড়স, মরিচ, শসা, লাউ, কুমড়াসহ বিভিন্ন সবজি, ডালজাতীয় ফসল, চা ও পান চাষে এ জৈব ছত্রাকনাশকের ইতিবাচক ফল পাওয়া গেছে। ফিউজারিয়াম উইল্ট, রুট রট, স্ক্লেরোটিয়াম ব্লাইট ও পাতার দাগ রোগ নিয়ন্ত্রণেও এটি কার্যকর বলে জানিয়েছেন গবেষকরা।

মাঠপর্যায়ের পরীক্ষায় টমেটোতে ৪০ থেকে ৭০ শতাংশ, আলুতে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ, ধানে ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ, গমে ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ এবং চা গাছে ৮০ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত ফলন বৃদ্ধির তথ্য পাওয়া গেছে। এছাড়া মরিচ ও ডালজাতীয় ফসলে বীজবাহিত ছত্রাকজনিত রোগ ৫০ থেকে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত দমন করা সম্ভব হয়েছে।

অধ্যাপক মঞ্জিল বলেন, পিজি-ট্রাইকোডার্মা উদ্ভিদের শিকড়ের বৃদ্ধি ত্বরান্বিত করে, পুষ্টি গ্রহণের সক্ষমতা বাড়ায় এবং মাটির জৈবিক স্বাস্থ্য উন্নত করে। পাশাপাশি রাসায়নিক সারের প্রয়োজনীয়তা কমিয়ে প্রাকৃতিকভাবে রোগ ও পোকামাকড় দমনে সহায়তা করে।

কৃষির পাশাপাশি ছাদকৃষি ও মৎস্য খাতেও এ প্রযুক্তির সম্ভাবনা রয়েছে। গবেষকরা জানান, মাছের অব্যবহৃত খাদ্য ও বর্জ্যের কারণে পানির গুণগত মান কমে যায়। ট্রাইকোডার্মাভিত্তিক এ পণ্য ব্যবহারে পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেন (ডিও) বাড়ানো এবং অ্যামোনিয়ার পরিমাণ কমানো সম্ভব হতে পারে। তবে মৎস্য খাতে এর কার্যকারিতা যাচাইয়ে আরও বড় পরিসরে পরীক্ষা প্রয়োজন।

গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, পণ্যটি বর্তমানে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের (বিএআরসি) নির্ধারিত স্ট্যান্ডার্ডাইজেশন ও নিবন্ধন প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। নিবন্ধন সম্পন্ন হলে দেশীয় প্রযুক্তিতে উদ্ভাবিত এ পরিবেশবান্ধব বায়ো-পণ্য কৃষকদের জন্য সহজলভ্য হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

গবেষকদের মতে, প্রযুক্তিটি দেশের টেকসই কৃষি উন্নয়ন, নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন এবং রাসায়নিক বালাইনাশকের ব্যবহার কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

২৫ বছরের গবেষণায় বাকৃবির সাফল্য, দেশে প্রথম দেশীয় জৈব ছত্রাকনাশক উদ্ভাবন

আপডেট সময় : ০২:২৮:৫২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৪ জুলাই ২০২৬

নিজস্ব প্রতিবেদক, ময়মনসিংহ:
দীর্ঘ ২৫ বছরের নিরবচ্ছিন্ন গবেষণার পর বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো দেশীয় প্রযুক্তিতে ট্রাইকোডার্মাভিত্তিক জৈব ছত্রাকনাশক উদ্ভাবন করেছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) একদল গবেষক।

দেশীয় উৎসের ট্রাইকোডার্মা অ্যাসপেরেলাম ব্যবহার করে তৈরি এ বায়োফরমুলেশন একই সঙ্গে জৈব ছত্রাকনাশক ও জৈব সার হিসেবে কাজ করে। প্রতি গ্রাম পণ্যে ন্যূনতম ২০ লাখ জীবন্ত ট্রাইকোডার্মা স্পোর রয়েছে। গবেষকদের দাবি, এটি বিভিন্ন ফসলের রোগ দমন, ফলন বৃদ্ধি, মাটির স্বাস্থ্য উন্নয়ন এবং মৎস্য খাতে পানির গুণগত মান উন্নত করতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

প্রধান গবেষক ও বাকৃবির উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শাহজাহান মঞ্জিল বলেন, দেশে ব্যবহৃত মোট বালাইনাশকের প্রায় ৪৫ থেকে ৪৬ শতাংশই রাসায়নিক ছত্রাকনাশক। এসব রাসায়নিকের অতিরিক্ত ব্যবহারে ক্ষতিকর ছত্রাকের পাশাপাশি মাটির উপকারী অণুজীবও ধ্বংস হয়। ফলে পরিবেশ, মাটির স্বাস্থ্য ও জনস্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

এ বাস্তবতায় পরিবেশবান্ধব ও টেকসই বিকল্প হিসেবে উদ্ভাবন করা হয়েছে ‘পিজি-ট্রাইকোডার্মা’, যা একই সঙ্গে জৈব ছত্রাকনাশক ও জৈব সার হিসেবে কাজ করে।

গবেষকরা জানান, গবেষণার শুরুতে দেশের বিভিন্ন কৃষি-পরিবেশ অঞ্চল থেকে হাজার হাজার মাটি ও রাইজোস্ফিয়ার নমুনা সংগ্রহ করা হয়। সেখান থেকে শতাধিক ট্রাইকোডার্মা ছত্রাক পৃথক করে দীর্ঘদিন কার্যকারিতা যাচাই-বাছাই করা হয়। পরে বাংলাদেশের জলবায়ুর সঙ্গে সবচেয়ে বেশি অভিযোজিত ও কার্যকর ট্রাইকোডার্মা অ্যাসপেরেলাম নির্বাচন করে এর ভিত্তিতে বায়োফরমুলেশন তৈরি করা হয়।

গবেষণায় দেখা গেছে, টমেটো, আলু, বেগুন, ঢেঁড়স, মরিচ, শসা, লাউ, কুমড়াসহ বিভিন্ন সবজি, ডালজাতীয় ফসল, চা ও পান চাষে এ জৈব ছত্রাকনাশকের ইতিবাচক ফল পাওয়া গেছে। ফিউজারিয়াম উইল্ট, রুট রট, স্ক্লেরোটিয়াম ব্লাইট ও পাতার দাগ রোগ নিয়ন্ত্রণেও এটি কার্যকর বলে জানিয়েছেন গবেষকরা।

মাঠপর্যায়ের পরীক্ষায় টমেটোতে ৪০ থেকে ৭০ শতাংশ, আলুতে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ, ধানে ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ, গমে ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ এবং চা গাছে ৮০ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত ফলন বৃদ্ধির তথ্য পাওয়া গেছে। এছাড়া মরিচ ও ডালজাতীয় ফসলে বীজবাহিত ছত্রাকজনিত রোগ ৫০ থেকে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত দমন করা সম্ভব হয়েছে।

অধ্যাপক মঞ্জিল বলেন, পিজি-ট্রাইকোডার্মা উদ্ভিদের শিকড়ের বৃদ্ধি ত্বরান্বিত করে, পুষ্টি গ্রহণের সক্ষমতা বাড়ায় এবং মাটির জৈবিক স্বাস্থ্য উন্নত করে। পাশাপাশি রাসায়নিক সারের প্রয়োজনীয়তা কমিয়ে প্রাকৃতিকভাবে রোগ ও পোকামাকড় দমনে সহায়তা করে।

কৃষির পাশাপাশি ছাদকৃষি ও মৎস্য খাতেও এ প্রযুক্তির সম্ভাবনা রয়েছে। গবেষকরা জানান, মাছের অব্যবহৃত খাদ্য ও বর্জ্যের কারণে পানির গুণগত মান কমে যায়। ট্রাইকোডার্মাভিত্তিক এ পণ্য ব্যবহারে পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেন (ডিও) বাড়ানো এবং অ্যামোনিয়ার পরিমাণ কমানো সম্ভব হতে পারে। তবে মৎস্য খাতে এর কার্যকারিতা যাচাইয়ে আরও বড় পরিসরে পরীক্ষা প্রয়োজন।

গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, পণ্যটি বর্তমানে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের (বিএআরসি) নির্ধারিত স্ট্যান্ডার্ডাইজেশন ও নিবন্ধন প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। নিবন্ধন সম্পন্ন হলে দেশীয় প্রযুক্তিতে উদ্ভাবিত এ পরিবেশবান্ধব বায়ো-পণ্য কৃষকদের জন্য সহজলভ্য হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

গবেষকদের মতে, প্রযুক্তিটি দেশের টেকসই কৃষি উন্নয়ন, নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন এবং রাসায়নিক বালাইনাশকের ব্যবহার কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।