ঢাকা ০৬:৫৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬, ১৪ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
ময়মনসিংহে অন্যরকম হাট, যেখানে বিক্রি হয় মানুষ ময়মনসিংহ মেডিকেলে ডেঙ্গুতে কিশোরের মৃত্যু, হাসপাতালে ভর্তি ৪৪ রোগী হবিগঞ্জে বিএনপি-এনসিপির পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি ঘিরে ১৪৪ ধারা জারি কেরানীগঞ্জের ঝিলমিল হাসপাতালে কতৃপক্ষের অবহেলা ও ভুল চিকিৎসায় মাদ্রাসা শিক্ষক মৃত্যুর অভিযোগ। উখিয়ায় সমাজসেবকের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর ও চাঁদা দাবির অভিযোগ মোবাইল হ্যাক করে ৩ লাখ টাকা আত্মসাৎ: ময়মনসিংহে র‌্যাবের হাতে গ্রেফতার ১ শেরপুরের গজনী এলাকায় বিজিবির অভিযান: ৩২১ বোতল ভারতীয় মদ জব্দ, ৫ পাচারকারী পলাতক কেরানীগঞ্জে বোমা খোকনএক ব্যক্তির বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ, তদন্তের দাবি। দিঘারকান্দা সিএনজি পাম্পে সাংবাদিকদের ওপর হামলার চেষ্টা, নানা অনিয়মের অভিযোগ নেত্রকোনায় সৌর বিদ্যুৎ খাতের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে মতবিনিময় সভা

ময়মনসিংহে অন্যরকম হাট, যেখানে বিক্রি হয় মানুষ

অনলাইন ডেস্ক
  • আপডেট সময় : ০৭:২৮:৩৬ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬
  • / 14
আজকের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

ভোরের আলো তখনো পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েনি। সকাল ৭টা বাজতেই ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলা মহিলা কলেজ মোড়ে একে একে জড়ো হতে থাকেন শতাধিক মানুষ। কারও হাতে কোদাল, কারও হাতে বেলচা, কেউ আবার খালি হাতেই দাঁড়িয়ে আছেন রাস্তার পাশে। তাদের সবার লক্ষ্য একটাই—আজকের দিনের জন্য একটি কাজ জোটানো।

এটি কোনো পশুর হাট নয়, নয় কোনো পণ্যের বাজার। এটি শ্রমের হাট। এখানে প্রতিদিন নিজেদের শ্রম বিক্রি করতে আসেন নির্মাণশ্রমিক, মাটি কাটার শ্রমিক, রাজমিস্ত্রির, রংমিস্ত্রি, কৃষিশ্রমিকসহ বিভিন্ন পেশার দিনমজুররা। সকাল ৭টা থেকে শুরু হয়ে চলে প্রায় সকাল সাড়ে ৯টা পর্যন্ত। এই সময়ের মধ্যেই ঠিকাদার, বাড়ির মালিক কিংবা বিভিন্ন কাজের জন্য শ্রমিক প্রয়োজন, এমন ব্যক্তিরা এসে দরদাম করে শ্রমিক নিয়ে যান। স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষায় এটি ‘শ্রমিকের হাট’।

একই চিত্র দেখা যায় ময়মনসিংহ নগরীর চরপাড়া মোড়েও। ভোর থেকে সেখানে কাজের আশায় অপেক্ষা করেন অসংখ্য দিনমজুর। কাজ মিললে দিন ভালো কাটে, না মিললে খালি হাতেই বাড়ি ফিরতে হয়।

ত্রিশালের আমিরাবাড়ি এলাকার নির্মাণশ্রমিক মো. বাবুল মিয়া বলেন, প্রতিদিন সকালে এখানে আসি। ভাগ্য ভালো থাকলে কাজ পাই, না হলে দুপুরের আগেই বাড়ি ফিরতে হয়। এখন সাধারণ শ্রমিকের মজুরি ৫৫০ থেকে ৬০০ টাকার মধ্যে। তবে সব দিন সমান কাজ থাকে না।

 

শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বর্ষা মৌসুমে নির্মাণকাজ কমে গেলে আয়ও কমে যায়। আবার ধান কাটা কিংবা বোরো মৌসুমে কৃষিশ্রমিকের চাহিদা বাড়লে অনেকের কাজের সুযোগও বাড়ে। তবে বছরের অধিকাংশ সময়ই কাজের অনিশ্চয়তা তাদের নিত্যসঙ্গী।

কাজ না পেলে সংসারে সংকট নেমে আসার কথা জানান শ্রমিকদের অনেকেই। তারা জানান, দৈনিক আয়ের ওপর নির্ভরশীল তারা। এক দিন কাজ না হলে সেদিনের বাজারও অনিশ্চিত হয়ে পড়তে হয়।

শ্রমিক আবদুল কুদ্দুস বলেন, আমাদের কোনো মাসিক বেতন নাই। আজ কাজ করলে আজ খাওয়া হবে। কাজ না থাকলে ধার করে সংসার চালাতে হয়।

আরেক শ্রমিক জসিম উদ্দিন বলেন, সকালে সবাই দাঁড়িয়ে থাকি। যার ভাগ্যে কাজ জোটে সে চলে যায়। যারা থেকে যায়, তাদের মনটা খারাপ হয়ে যায়।

প্রতিদিন বিভিন্ন এলাকা থেকে ঠিকাদার, বাড়ির মালিক কিংবা ব্যবসায়ীরা শ্রমিক নিতে আসেন। কাজের ধরন অনুযায়ী মজুরি নির্ধারণ করা হয়। দক্ষ শ্রমিকদের মজুরি তুলনামূলক বেশি হলেও সাধারণ শ্রমিকদের ক্ষেত্রে ৫৫০ থেকে ৬০০ টাকার মধ্যেই দরদাম শেষ হয়।

শ্রমিক নিতে আসা ত্রিশাল পৌর এলাকার বাসিন্দা মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, বাড়ির নির্মাণকাজের জন্য মাঝেমধ্যে এখান থেকে শ্রমিক নিয়ে যাই। এখানে একসঙ্গে অনেক শ্রমিক পাওয়া যায়, তাই সময়ও বাঁচে।

স্থানীয় ঠিকাদার শাহীন মিয়া বলেন, ভালো ও অভিজ্ঞ শ্রমিক পেতে হলে একটু বেশি মজুরি দিতে হয়। তবে কাজের বাজার আগের তুলনায় কিছুটা মন্দ।

শ্রমিকদের কারও বয়স ২০, কারও ৬০ ছুঁইছুঁই। বয়স বাড়লেও থেমে নেই সংগ্রাম। পরিবারের ভরণপোষণ, সন্তানের লেখাপড়া কিংবা চিকিৎসার খরচ মেটাতে প্রতিদিনই তাদের দাঁড়াতে হয় এই হাটে।

এই ধরনের শ্রমিকের হাট দেশের অনানুষ্ঠানিক শ্রমবাজারের একটি বাস্তব চিত্র। যেখানে প্রতিদিন হাজারো মানুষ কোনো স্থায়ী চাকরি বা সামাজিক নিরাপত্তা ছাড়া শুধু একটি দিনের কাজের আশায় অপেক্ষা করেন।

সূর্য যখন একটু ওপরে ওঠে, তখন হাটটিও ফাঁকা হতে শুরু করে। কেউ কাজ পেয়ে চলে যান নির্মাণস্থলে, কেউ যান কৃষিজমিতে, কেউ আবার মাটি কাটার কাজে। আর যাদের ভাগ্যে কাজ জোটে না, তারা ফিরে যান বাড়ির পথে পরদিন আবার ভোরে একই জায়গায় দাঁড়ানোর প্রত্যাশা নিয়ে।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

ময়মনসিংহে অন্যরকম হাট, যেখানে বিক্রি হয় মানুষ

আপডেট সময় : ০৭:২৮:৩৬ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬

ভোরের আলো তখনো পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েনি। সকাল ৭টা বাজতেই ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলা মহিলা কলেজ মোড়ে একে একে জড়ো হতে থাকেন শতাধিক মানুষ। কারও হাতে কোদাল, কারও হাতে বেলচা, কেউ আবার খালি হাতেই দাঁড়িয়ে আছেন রাস্তার পাশে। তাদের সবার লক্ষ্য একটাই—আজকের দিনের জন্য একটি কাজ জোটানো।

এটি কোনো পশুর হাট নয়, নয় কোনো পণ্যের বাজার। এটি শ্রমের হাট। এখানে প্রতিদিন নিজেদের শ্রম বিক্রি করতে আসেন নির্মাণশ্রমিক, মাটি কাটার শ্রমিক, রাজমিস্ত্রির, রংমিস্ত্রি, কৃষিশ্রমিকসহ বিভিন্ন পেশার দিনমজুররা। সকাল ৭টা থেকে শুরু হয়ে চলে প্রায় সকাল সাড়ে ৯টা পর্যন্ত। এই সময়ের মধ্যেই ঠিকাদার, বাড়ির মালিক কিংবা বিভিন্ন কাজের জন্য শ্রমিক প্রয়োজন, এমন ব্যক্তিরা এসে দরদাম করে শ্রমিক নিয়ে যান। স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষায় এটি ‘শ্রমিকের হাট’।

একই চিত্র দেখা যায় ময়মনসিংহ নগরীর চরপাড়া মোড়েও। ভোর থেকে সেখানে কাজের আশায় অপেক্ষা করেন অসংখ্য দিনমজুর। কাজ মিললে দিন ভালো কাটে, না মিললে খালি হাতেই বাড়ি ফিরতে হয়।

ত্রিশালের আমিরাবাড়ি এলাকার নির্মাণশ্রমিক মো. বাবুল মিয়া বলেন, প্রতিদিন সকালে এখানে আসি। ভাগ্য ভালো থাকলে কাজ পাই, না হলে দুপুরের আগেই বাড়ি ফিরতে হয়। এখন সাধারণ শ্রমিকের মজুরি ৫৫০ থেকে ৬০০ টাকার মধ্যে। তবে সব দিন সমান কাজ থাকে না।

 

শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বর্ষা মৌসুমে নির্মাণকাজ কমে গেলে আয়ও কমে যায়। আবার ধান কাটা কিংবা বোরো মৌসুমে কৃষিশ্রমিকের চাহিদা বাড়লে অনেকের কাজের সুযোগও বাড়ে। তবে বছরের অধিকাংশ সময়ই কাজের অনিশ্চয়তা তাদের নিত্যসঙ্গী।

কাজ না পেলে সংসারে সংকট নেমে আসার কথা জানান শ্রমিকদের অনেকেই। তারা জানান, দৈনিক আয়ের ওপর নির্ভরশীল তারা। এক দিন কাজ না হলে সেদিনের বাজারও অনিশ্চিত হয়ে পড়তে হয়।

শ্রমিক আবদুল কুদ্দুস বলেন, আমাদের কোনো মাসিক বেতন নাই। আজ কাজ করলে আজ খাওয়া হবে। কাজ না থাকলে ধার করে সংসার চালাতে হয়।

আরেক শ্রমিক জসিম উদ্দিন বলেন, সকালে সবাই দাঁড়িয়ে থাকি। যার ভাগ্যে কাজ জোটে সে চলে যায়। যারা থেকে যায়, তাদের মনটা খারাপ হয়ে যায়।

প্রতিদিন বিভিন্ন এলাকা থেকে ঠিকাদার, বাড়ির মালিক কিংবা ব্যবসায়ীরা শ্রমিক নিতে আসেন। কাজের ধরন অনুযায়ী মজুরি নির্ধারণ করা হয়। দক্ষ শ্রমিকদের মজুরি তুলনামূলক বেশি হলেও সাধারণ শ্রমিকদের ক্ষেত্রে ৫৫০ থেকে ৬০০ টাকার মধ্যেই দরদাম শেষ হয়।

শ্রমিক নিতে আসা ত্রিশাল পৌর এলাকার বাসিন্দা মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, বাড়ির নির্মাণকাজের জন্য মাঝেমধ্যে এখান থেকে শ্রমিক নিয়ে যাই। এখানে একসঙ্গে অনেক শ্রমিক পাওয়া যায়, তাই সময়ও বাঁচে।

স্থানীয় ঠিকাদার শাহীন মিয়া বলেন, ভালো ও অভিজ্ঞ শ্রমিক পেতে হলে একটু বেশি মজুরি দিতে হয়। তবে কাজের বাজার আগের তুলনায় কিছুটা মন্দ।

শ্রমিকদের কারও বয়স ২০, কারও ৬০ ছুঁইছুঁই। বয়স বাড়লেও থেমে নেই সংগ্রাম। পরিবারের ভরণপোষণ, সন্তানের লেখাপড়া কিংবা চিকিৎসার খরচ মেটাতে প্রতিদিনই তাদের দাঁড়াতে হয় এই হাটে।

এই ধরনের শ্রমিকের হাট দেশের অনানুষ্ঠানিক শ্রমবাজারের একটি বাস্তব চিত্র। যেখানে প্রতিদিন হাজারো মানুষ কোনো স্থায়ী চাকরি বা সামাজিক নিরাপত্তা ছাড়া শুধু একটি দিনের কাজের আশায় অপেক্ষা করেন।

সূর্য যখন একটু ওপরে ওঠে, তখন হাটটিও ফাঁকা হতে শুরু করে। কেউ কাজ পেয়ে চলে যান নির্মাণস্থলে, কেউ যান কৃষিজমিতে, কেউ আবার মাটি কাটার কাজে। আর যাদের ভাগ্যে কাজ জোটে না, তারা ফিরে যান বাড়ির পথে পরদিন আবার ভোরে একই জায়গায় দাঁড়ানোর প্রত্যাশা নিয়ে।