ঢাকা ১১:২৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৫ মে ২০২৬, ১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
তারাকান্দায় ১ কেজি গাঁজাসহ মাদক ব্যবসায়ী গ্রেফতার ​ময়মনসিংহে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বড় সাফল্য: একদিনে মাদক, চোরাচালান পণ্য ও চোরচক্রের ৯ সদস্য গ্রেফতার ময়মনসিংহের ধোবাউড়ায় ৫৪৯ বোতল মদসহ তিনজন আটক ময়মনসিংহে মোটরসাইকেল চোর চক্রের তিন সদস্য গ্রেফতার অযথা বাইকের হর্ন ও শব্দদূষণ রোধে ময়মনসিংহে মানববন্ধন শেরেবাংলা নগরে সাংবাদিকের ব্যাগ ছিনতাই, মোবাইল-ব্যাংক কার্ডসহ গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র খোয়াছেন বাজেট ২০২৬-২৭ নিত্য পণ্যে কর ছাড়, অস্ত্র ও বিলাসী গাড়িতে বাড়তি কর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে ড্রোন হামলায় প্রাণ গেল ময়মনসিংহের যুবক রহিমের, লাশ ফেরাতে সরকারের কাছে আকুতি পরিবারের ঈশ্বরগঞ্জে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড, গ্রামবাসীর প্রচেষ্টায় নিয়ন্ত্রণে হালুয়াঘাটে পাহাড়ি ঢল ও বৃষ্টিতে শতাধিক হেক্টর ফসল তলিয়ে ক্ষতি চরম দুশ্চিন্তায় কৃষক, যোগাযোগ ব্যবস্থাও ঝুঁকিতে

ভালুকায় তরুণের ব্যতিক্রমী উদ্যোগ, ২০ জাতের আঙুরে ভরেছে বাগান

অনলাইন ডেস্ক
  • আপডেট সময় : ০৮:৪৫:৩৩ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৭ মে ২০২৬
  • / 35
আজকের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

 

ময়মনসিংহের ভালুকায় এক তরুণের গল্প এখন অনেকের মুখে মুখে। কোনো কৃষি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র নয়, তার শেখার জায়গা ছিল ফেসবুক আর ইউটিউব। সেখান থেকেই আঙুর চাষের কৌশল আয়ত্ত করে মো. মোকছেদুল ইসলাম আজ নিজের বাগানে চাষ করেছেন তার সাফল্যের ফল। অন্তত ২০ জাতের আঙুর রয়েছে তার বাগানে।

ভালুকা উপজেলার মল্লিকবাড়ি গ্রামের বাসিন্দা মোকছেদুল ইসলাম, স্থানীয় মসজিদের ইমাম মো. খুরশেদ আলমের ছেলে। সম্প্রতি কামিল (মাস্টার্স) পরীক্ষা দিয়েছেন তিনি। পড়ালেখার পাশাপাশি ছোটবেলা থেকেই কৃষির সঙ্গে ছিল তার সম্পর্ক। তবে জীবনের বাস্তবতা তাকে ২০২২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত একটি গার্মেন্টসে শ্রমিক হিসেবে কাজ করতে বাধ্য করে। সেই শ্রমের জমানো টাকাই আজ তার স্বপ্নের বাগানের মূল পুঁজি।

গত মঙ্গলবার (৫ মে) দুপুরে তার বাড়িতে গেলে চোখে পড়ে পাকা সড়কের পাশে বড় একটি সাইনবোর্ড আর তার ঠিক পাশেই আঙুরের বাগান। সেখান থেকেই তৈরি হয় চারা, যা দিয়ে বাড়ির পেছনের ১৪ শতক জমিতে গড়ে তুলেছেন ১৮০টি গাছের বাগান। ভ্যালেজ, ডিক্সন, গ্রিন লং, একেলো, ব্ল্যাক রুবি, বাইকুনুর, সামার ব্ল্যাকসহ অন্তত ২০ জাতের আঙুরে এখন সবুজ বাগান ভরে উঠেছে। ডালভর্তি টসটসে আঙুর যেন তার পরিশ্রমেরই প্রতিচ্ছবি।

বাগানে কাজ করতে করতেই নিজের শুরুর গল্প বলেন মোকছেদুল। “শুনতাম আঙুর নাকি টক হয়। শখ করে ২০২২ সালে দুইটা গাছ লাগাই। পরে দেখি কিছুটা মিষ্টি। তখনই মাথায় আসে, মিষ্টি আঙুর কি সম্ভব? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে ফেসবুক-ইউটিউব ঘাঁটতে শুরু করি।”

সেই খোঁজই তাকে নিয়ে যায় বিভিন্ন গ্রুপ, ভিডিও আর বিদেশি চাষিদের কাছে। ধীরে ধীরে যোগাযোগ করে সংগ্রহ করেন বিভিন্ন জাতের চারা। শুধু তাই নয়, ইন্দোনেশিয়ার এক বাগানির ভিডিও দেখে নিজেই শিখে ফেলেন চারা উৎপাদনের কৌশল। কয়েক দফায় ২০ জাতের আঙুর সংগ্রহ করে বাড়ির সামনে লাগান। ফলন আসে, মিষ্টতাও আসে। সেই আঙুর খাইয়ে আশপাশের মানুষের প্রশংসাই তাকে বাণিজ্যিক চাষে নামতে উৎসাহ দেয়।

গত বছর ১৮০টি চারা রোপণ করেন তিনি। চলতি বছর সেই বাগানেই এসেছে প্রথম বাণিজ্যিক ফলন। মোকছেদুল জানান, এখন পর্যন্ত প্রায় ৩ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। ‘গার্মেন্টসে কাজ করে এই টাকা জোগাড় করেছি। আশা করছি, এবার ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা কেজি দরে আঙুর বিক্রি করে দেড় লাখ টাকার বেশি আয় করতে পারবো। পাশাপাশি প্রতি চারা ৪০০-৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, সেখান থেকেও ভালো আয় আসবে।’

তবে চ্যালেঞ্জও কম নয়। সবচেয়ে বড় সমস্যা বৃষ্টি। ফল পাকার সময় অতিরিক্ত বৃষ্টি হলে পচন ধরে। এ সমস্যার সমাধানে বিদেশি প্রযুক্তির দিকে নজর দিয়েছেন তিনি।

মোকছেদুল বলেন, বাইরে দেখি পলি নেট হাউস ব্যবহার করে। এটা যদি আমরা করতে পারি, তাহলে দেশে বাণিজ্যিকভাবে আঙুর উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব, এমনকি রপ্তানিও করা যাবে।

তার এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ দেখতে প্রতিদিনই ভিড় করছেন আশপাশের মানুষ। স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ আলম মিয়া বলেন, এত সুন্দর আর এত জাতের আঙুর এক সঙ্গে আগে দেখিনি। খেতেও খুব ভালো।

এনজিওকর্মী মো. শাহীনুর আলম বাগান ঘুরে এসে বলেন, আঙুর খেয়ে অবাক হয়েছি, এত মিষ্টি! চাকরি শেষে অবসরে গিয়ে আমিও এমন একটা বাগান করতে চাই।

স্থানীয় উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. রাশেদুজ্জামান নিয়মিত বাগান তদারকি করেন। তিনি জানান, আঙুর একটি সম্ভাবনাময় ফসল। ১৪ শতক জমিতে ১৮০টি গাছ লাগিয়ে ভালো ফলন পাওয়া গেছে। আমরা নিয়মিত পরামর্শ দিচ্ছি।

ভালুকা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নুসরাত জামানও আশাবাদী। তার মতে, এ অঞ্চলের মাটি ফল চাষের জন্য উপযোগী। আঙুর যেহেতু মিষ্টি হচ্ছে, তাই এর সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে। সংরক্ষণ ও মিষ্টতা বাড়াতে গবেষণা হলে এটি দেশের জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি করবে।

ফেসবুক-ইউটিউব থেকে শেখা, গার্মেন্টসের কষ্টার্জিত টাকা আর অদম্য ইচ্ছাশক্তি এই তিনের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে মোকছেদুল ইসলামের আঙুর বাগান। তার গল্প শুধু একটি সফলতার নয়, বরং প্রমাণ করে সুযোগ না থাকলেও শেখার পথ বন্ধ হয় না।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

ভালুকায় তরুণের ব্যতিক্রমী উদ্যোগ, ২০ জাতের আঙুরে ভরেছে বাগান

আপডেট সময় : ০৮:৪৫:৩৩ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৭ মে ২০২৬

 

ময়মনসিংহের ভালুকায় এক তরুণের গল্প এখন অনেকের মুখে মুখে। কোনো কৃষি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র নয়, তার শেখার জায়গা ছিল ফেসবুক আর ইউটিউব। সেখান থেকেই আঙুর চাষের কৌশল আয়ত্ত করে মো. মোকছেদুল ইসলাম আজ নিজের বাগানে চাষ করেছেন তার সাফল্যের ফল। অন্তত ২০ জাতের আঙুর রয়েছে তার বাগানে।

ভালুকা উপজেলার মল্লিকবাড়ি গ্রামের বাসিন্দা মোকছেদুল ইসলাম, স্থানীয় মসজিদের ইমাম মো. খুরশেদ আলমের ছেলে। সম্প্রতি কামিল (মাস্টার্স) পরীক্ষা দিয়েছেন তিনি। পড়ালেখার পাশাপাশি ছোটবেলা থেকেই কৃষির সঙ্গে ছিল তার সম্পর্ক। তবে জীবনের বাস্তবতা তাকে ২০২২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত একটি গার্মেন্টসে শ্রমিক হিসেবে কাজ করতে বাধ্য করে। সেই শ্রমের জমানো টাকাই আজ তার স্বপ্নের বাগানের মূল পুঁজি।

গত মঙ্গলবার (৫ মে) দুপুরে তার বাড়িতে গেলে চোখে পড়ে পাকা সড়কের পাশে বড় একটি সাইনবোর্ড আর তার ঠিক পাশেই আঙুরের বাগান। সেখান থেকেই তৈরি হয় চারা, যা দিয়ে বাড়ির পেছনের ১৪ শতক জমিতে গড়ে তুলেছেন ১৮০টি গাছের বাগান। ভ্যালেজ, ডিক্সন, গ্রিন লং, একেলো, ব্ল্যাক রুবি, বাইকুনুর, সামার ব্ল্যাকসহ অন্তত ২০ জাতের আঙুরে এখন সবুজ বাগান ভরে উঠেছে। ডালভর্তি টসটসে আঙুর যেন তার পরিশ্রমেরই প্রতিচ্ছবি।

বাগানে কাজ করতে করতেই নিজের শুরুর গল্প বলেন মোকছেদুল। “শুনতাম আঙুর নাকি টক হয়। শখ করে ২০২২ সালে দুইটা গাছ লাগাই। পরে দেখি কিছুটা মিষ্টি। তখনই মাথায় আসে, মিষ্টি আঙুর কি সম্ভব? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে ফেসবুক-ইউটিউব ঘাঁটতে শুরু করি।”

সেই খোঁজই তাকে নিয়ে যায় বিভিন্ন গ্রুপ, ভিডিও আর বিদেশি চাষিদের কাছে। ধীরে ধীরে যোগাযোগ করে সংগ্রহ করেন বিভিন্ন জাতের চারা। শুধু তাই নয়, ইন্দোনেশিয়ার এক বাগানির ভিডিও দেখে নিজেই শিখে ফেলেন চারা উৎপাদনের কৌশল। কয়েক দফায় ২০ জাতের আঙুর সংগ্রহ করে বাড়ির সামনে লাগান। ফলন আসে, মিষ্টতাও আসে। সেই আঙুর খাইয়ে আশপাশের মানুষের প্রশংসাই তাকে বাণিজ্যিক চাষে নামতে উৎসাহ দেয়।

গত বছর ১৮০টি চারা রোপণ করেন তিনি। চলতি বছর সেই বাগানেই এসেছে প্রথম বাণিজ্যিক ফলন। মোকছেদুল জানান, এখন পর্যন্ত প্রায় ৩ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। ‘গার্মেন্টসে কাজ করে এই টাকা জোগাড় করেছি। আশা করছি, এবার ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা কেজি দরে আঙুর বিক্রি করে দেড় লাখ টাকার বেশি আয় করতে পারবো। পাশাপাশি প্রতি চারা ৪০০-৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, সেখান থেকেও ভালো আয় আসবে।’

তবে চ্যালেঞ্জও কম নয়। সবচেয়ে বড় সমস্যা বৃষ্টি। ফল পাকার সময় অতিরিক্ত বৃষ্টি হলে পচন ধরে। এ সমস্যার সমাধানে বিদেশি প্রযুক্তির দিকে নজর দিয়েছেন তিনি।

মোকছেদুল বলেন, বাইরে দেখি পলি নেট হাউস ব্যবহার করে। এটা যদি আমরা করতে পারি, তাহলে দেশে বাণিজ্যিকভাবে আঙুর উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব, এমনকি রপ্তানিও করা যাবে।

তার এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ দেখতে প্রতিদিনই ভিড় করছেন আশপাশের মানুষ। স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ আলম মিয়া বলেন, এত সুন্দর আর এত জাতের আঙুর এক সঙ্গে আগে দেখিনি। খেতেও খুব ভালো।

এনজিওকর্মী মো. শাহীনুর আলম বাগান ঘুরে এসে বলেন, আঙুর খেয়ে অবাক হয়েছি, এত মিষ্টি! চাকরি শেষে অবসরে গিয়ে আমিও এমন একটা বাগান করতে চাই।

স্থানীয় উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. রাশেদুজ্জামান নিয়মিত বাগান তদারকি করেন। তিনি জানান, আঙুর একটি সম্ভাবনাময় ফসল। ১৪ শতক জমিতে ১৮০টি গাছ লাগিয়ে ভালো ফলন পাওয়া গেছে। আমরা নিয়মিত পরামর্শ দিচ্ছি।

ভালুকা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নুসরাত জামানও আশাবাদী। তার মতে, এ অঞ্চলের মাটি ফল চাষের জন্য উপযোগী। আঙুর যেহেতু মিষ্টি হচ্ছে, তাই এর সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে। সংরক্ষণ ও মিষ্টতা বাড়াতে গবেষণা হলে এটি দেশের জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি করবে।

ফেসবুক-ইউটিউব থেকে শেখা, গার্মেন্টসের কষ্টার্জিত টাকা আর অদম্য ইচ্ছাশক্তি এই তিনের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে মোকছেদুল ইসলামের আঙুর বাগান। তার গল্প শুধু একটি সফলতার নয়, বরং প্রমাণ করে সুযোগ না থাকলেও শেখার পথ বন্ধ হয় না।