ঢাকা ০৬:০৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৯ এপ্রিল ২০২৬, ৬ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

এক জীবন, বহু পরিচয়ের পরিব্রাজক মোঃ আবুল মনসুর

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • আপডেট সময় : ১০:৪৪:৪৭ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১১ জুলাই ২০২৫
  • / 799
আজকের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

কিছু মানুষ থাকেন যাঁদের জীবন কেবল ব্যক্তিগত অর্জনের নয় বরং বৃহত্তর সমাজের সঙ্গে এক নিরবিচ্ছিন্ন সংলাপ। মোঃ আবুল মনসুর তেমনই একজন মানুষ, যাঁর প্রতিটি পদক্ষেপ যেন শিল্প, সামাজিক দায়বদ্ধতা ও মানবিক চেতনার এক সম্মিলিত যাত্রাপথ।

ময়মনসিংহের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে তাঁর নামটি আজ শুধু একটি পরিচয় নয়, অনেক তরুণ, শিল্পী ও নাগরিকের অনুপ্রেরণার উৎস। নাট্যকর্মী, সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক সংগঠক ও স্বেচ্ছাসেবক এই চারটি পরিচয়ের বাইরেও তিনি হয়ে উঠেছেন একটি বিস্তৃত মানবিক এবং সাংস্কৃতিক পরিসরের প্রতিভূ।

ধর্মীয়ভাবে রক্ষণশীল এক পারিবারিক পরিবেশে বেড়ে ওঠা আবুল মনসুরের শিল্পচর্চার পথ সহজ ছিল না। ছোটবেলা থেকেই বাধা পেরিয়ে, নীরবে শুরু করেন মঞ্চের সঙ্গে তার সংযোগ। সময়ের সঙ্গে সেই সংযোগ হয়ে ওঠে দৃঢ় ও সক্রিয়।

ছাত্রজীবনে নেতৃত্ব ও শৃঙ্খলার চর্চা শুরু হয় ময়মনসিংহ জিলা স্কুল ও নাসিরাবাদ কলেজে। তিনি ছিলেন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কাব স্কাউট, স্কুল ও কলেজের বিএনসিসির CUO, ৫ রমনা ব্যাটালিয়নের ক্যাডেট অ্যাডজুটেন্ট। সাঁতারে স্কুল পর্যায়ে টানা তিনবার চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়েও সাফল্য অর্জন করেন।

ইবাইস ইউনিভার্সিটি থেকে হোটেল ম্যানেজমেন্টে স্নাতক ও এমবিএ (মার্কেটিং) শেষ করে কাজ করেছেন রেডিসন, ওয়েস্টিন, ফু-ওয়াং ক্লাব, কেএসআরএম-এর মতো স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানে। কিন্তু আর্থিক নিরাপত্তা ও পেশাগত স্বাচ্ছন্দ্য ছেড়ে মনোনিবেশ করেন সাংস্কৃতিক চর্চা ও জনসেবায়।

২০০৭ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ‘অনসাম্বল থিয়েটার’। এ পর্যন্ত নির্দেশনা দিয়েছেন ৫০টিরও বেশি নাটকে এবং অভিনয় করেছেন ৮০টির বেশি নাটকে। তাঁর অভিনীত জনপ্রিয় মঞ্চ নাটকগুলোর মধ্যে রয়েছে—আই ক্যান্ট ব্রিদ, হিটলার ইন বাঙ্কার, কোর্ট মার্শাল, কঞ্জুস, সুবচন নির্বাসনে,পেজগী , খ্যাপা পাগলার প্যাঁচাল, বীরাঙ্গনার বয়ান প্রভৃতি।

এই নাটকগুলো শুধু বিনোদন নয়—তরুণ সমাজে প্রতিবাদ, সচেতনতা ও মূল্যবোধের বীজ বুনেছে। বাংলাদেশ ছাড়াও ভারতের বিভিন্ন মঞ্চে নাটক পরিবেশন করে তিনি দুই বাংলার মধ্যে সাংস্কৃতিক বিনিময়ের সেতুবন্ধ গড়েছেন।

আজ অনসাম্বল থিয়েটার ময়মনসিংহের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে একটি পরিচিত ও প্রতিষ্ঠিত নাম। প্রতিষ্ঠানটি ইতোমধ্যে আঞ্চলিক পর্যায়ে সৃজনশীল সাংস্কৃতিক কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ সম্মাননায় ভূষিত হয়েছে।

আবুল মনসুর টিভি নাটক, বিজ্ঞাপনচিত্র ও চলচ্চিত্রেও কাজ করছেন। পাশাপাশি সাংবাদিক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এশিয়ান টিভির জেলা প্রতিনিধি, এবং স্টাফ করেসপন্ডেন্ট হিসেবে লিখছেন “আমার সময়” ও “দ্য ডেইলি কান্ট্রি টুডে”-তে। নিজ উদ্যোগে গড়ে তুলেছেন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম আমগর টিভি।

করোনা মহামারির সময়, যখন চারপাশে অনিশ্চয়তা আর আতঙ্ক, তখন তিনি এক মাসের বেশি সময় ধরে রান্না করা খাবার পৌঁছে দিয়েছেন পথবাসী ও মানসিকভাবে অসুস্থ মানুষের হাতে। অক্সিজেন সেবা দিয়েছেন বাড়ি বাড়ি গিয়ে, গড়ে তুলেছেন ওয়ার্ডভিত্তিক স্বেচ্ছাসেবক দল।

অনসাম্বল থিয়েটার ছাড়াও তিনি যুক্ত আছেন বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন, ময়মনসিংহ নাট্য পরিষদ, ময়মনসিংহ জেলা নাগরিক আন্দোলন ও নিরাপদ সড়ক চাই-এর মতো সংগঠনে। বিভিন্ন সময়ে পেয়েছেন নাট্য, সামাজিক ও মানবিক সংগঠনের পক্ষ থেকে সম্মাননা ও কৃতজ্ঞতা স্মারক।

রাজনৈতিক দায়িত্ব পালনের অভিপ্রায়ে তিনি অংশ নেন ময়মনসিংহ সিটি কর্পোরেশনের কাউন্সিলর নির্বাচনে। উদ্দেশ্য ছিল সাংস্কৃতিক নেতৃত্বকে প্রশাসনিক বাস্তবতায় রূপ দেওয়া। কিন্তু নির্বাচনী রাজনীতির জটিলতা, প্রতিহিংসা ও অর্থবলনির্ভর প্রতিদ্বন্দ্বিতায় তাঁর জয় হয়নি।
তবুও তাঁর উপলব্ধি:

> “জনগণের কাছে আমি জিতেছি। এই অভিজ্ঞতা আমাকে নতুনভাবে ভাবতে শিখিয়েছে। আমি এখন শুধু থাকতে চাই একজন মানবিক শিল্পী ও অভিনেতা হিসেবে—কোনো রাজনৈতিক পরিচয়ে নয়।”

এই আত্মসচেতন সিদ্ধান্তের মাধ্যমে তিনি আবারও ফিরে এসেছেন তাঁর মূল জায়গা মঞ্চে। পরিকল্পনা করছেন তাঁর অভিনীত নাটক ‘আই ক্যান্ট ব্রিদ’ নিয়ে দেশের ৬৪ জেলায় ও বিভিন্ন দেশে প্রদর্শনী করার।

মোঃ আবুল মনসুর এমন একজন মানুষ, যিনি নিজের আরাম-আয়েশের চেয়ে বড় করে দেখেন মানুষের জন্য কিছু করার দায়িত্বকে। তাঁর জীবনে সংস্কৃতি, সাংবাদিকতা ও জনসেবার যে আন্তঃসম্পর্ক, তা আজকের সময়েও এক গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।

তিনি বলেন:

“শিল্প কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়—এটি দায়িত্ব পালনের ভাষা। একজন নাট্যকর্মী যত না সংলাপ বলেন, তার চেয়ে বেশি সমাজকে আয়না দেখান।”

আবুল মনসুর সেই আয়নার নির্মাতা, যার সামনে দাঁড়িয়ে সমাজ নিজেকে একটু গভীরভাবে চিনে নিতে পারে।

 

 

 

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

এক জীবন, বহু পরিচয়ের পরিব্রাজক মোঃ আবুল মনসুর

আপডেট সময় : ১০:৪৪:৪৭ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১১ জুলাই ২০২৫

কিছু মানুষ থাকেন যাঁদের জীবন কেবল ব্যক্তিগত অর্জনের নয় বরং বৃহত্তর সমাজের সঙ্গে এক নিরবিচ্ছিন্ন সংলাপ। মোঃ আবুল মনসুর তেমনই একজন মানুষ, যাঁর প্রতিটি পদক্ষেপ যেন শিল্প, সামাজিক দায়বদ্ধতা ও মানবিক চেতনার এক সম্মিলিত যাত্রাপথ।

ময়মনসিংহের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে তাঁর নামটি আজ শুধু একটি পরিচয় নয়, অনেক তরুণ, শিল্পী ও নাগরিকের অনুপ্রেরণার উৎস। নাট্যকর্মী, সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক সংগঠক ও স্বেচ্ছাসেবক এই চারটি পরিচয়ের বাইরেও তিনি হয়ে উঠেছেন একটি বিস্তৃত মানবিক এবং সাংস্কৃতিক পরিসরের প্রতিভূ।

ধর্মীয়ভাবে রক্ষণশীল এক পারিবারিক পরিবেশে বেড়ে ওঠা আবুল মনসুরের শিল্পচর্চার পথ সহজ ছিল না। ছোটবেলা থেকেই বাধা পেরিয়ে, নীরবে শুরু করেন মঞ্চের সঙ্গে তার সংযোগ। সময়ের সঙ্গে সেই সংযোগ হয়ে ওঠে দৃঢ় ও সক্রিয়।

ছাত্রজীবনে নেতৃত্ব ও শৃঙ্খলার চর্চা শুরু হয় ময়মনসিংহ জিলা স্কুল ও নাসিরাবাদ কলেজে। তিনি ছিলেন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কাব স্কাউট, স্কুল ও কলেজের বিএনসিসির CUO, ৫ রমনা ব্যাটালিয়নের ক্যাডেট অ্যাডজুটেন্ট। সাঁতারে স্কুল পর্যায়ে টানা তিনবার চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়েও সাফল্য অর্জন করেন।

ইবাইস ইউনিভার্সিটি থেকে হোটেল ম্যানেজমেন্টে স্নাতক ও এমবিএ (মার্কেটিং) শেষ করে কাজ করেছেন রেডিসন, ওয়েস্টিন, ফু-ওয়াং ক্লাব, কেএসআরএম-এর মতো স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানে। কিন্তু আর্থিক নিরাপত্তা ও পেশাগত স্বাচ্ছন্দ্য ছেড়ে মনোনিবেশ করেন সাংস্কৃতিক চর্চা ও জনসেবায়।

২০০৭ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ‘অনসাম্বল থিয়েটার’। এ পর্যন্ত নির্দেশনা দিয়েছেন ৫০টিরও বেশি নাটকে এবং অভিনয় করেছেন ৮০টির বেশি নাটকে। তাঁর অভিনীত জনপ্রিয় মঞ্চ নাটকগুলোর মধ্যে রয়েছে—আই ক্যান্ট ব্রিদ, হিটলার ইন বাঙ্কার, কোর্ট মার্শাল, কঞ্জুস, সুবচন নির্বাসনে,পেজগী , খ্যাপা পাগলার প্যাঁচাল, বীরাঙ্গনার বয়ান প্রভৃতি।

এই নাটকগুলো শুধু বিনোদন নয়—তরুণ সমাজে প্রতিবাদ, সচেতনতা ও মূল্যবোধের বীজ বুনেছে। বাংলাদেশ ছাড়াও ভারতের বিভিন্ন মঞ্চে নাটক পরিবেশন করে তিনি দুই বাংলার মধ্যে সাংস্কৃতিক বিনিময়ের সেতুবন্ধ গড়েছেন।

আজ অনসাম্বল থিয়েটার ময়মনসিংহের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে একটি পরিচিত ও প্রতিষ্ঠিত নাম। প্রতিষ্ঠানটি ইতোমধ্যে আঞ্চলিক পর্যায়ে সৃজনশীল সাংস্কৃতিক কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ সম্মাননায় ভূষিত হয়েছে।

আবুল মনসুর টিভি নাটক, বিজ্ঞাপনচিত্র ও চলচ্চিত্রেও কাজ করছেন। পাশাপাশি সাংবাদিক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এশিয়ান টিভির জেলা প্রতিনিধি, এবং স্টাফ করেসপন্ডেন্ট হিসেবে লিখছেন “আমার সময়” ও “দ্য ডেইলি কান্ট্রি টুডে”-তে। নিজ উদ্যোগে গড়ে তুলেছেন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম আমগর টিভি।

করোনা মহামারির সময়, যখন চারপাশে অনিশ্চয়তা আর আতঙ্ক, তখন তিনি এক মাসের বেশি সময় ধরে রান্না করা খাবার পৌঁছে দিয়েছেন পথবাসী ও মানসিকভাবে অসুস্থ মানুষের হাতে। অক্সিজেন সেবা দিয়েছেন বাড়ি বাড়ি গিয়ে, গড়ে তুলেছেন ওয়ার্ডভিত্তিক স্বেচ্ছাসেবক দল।

অনসাম্বল থিয়েটার ছাড়াও তিনি যুক্ত আছেন বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন, ময়মনসিংহ নাট্য পরিষদ, ময়মনসিংহ জেলা নাগরিক আন্দোলন ও নিরাপদ সড়ক চাই-এর মতো সংগঠনে। বিভিন্ন সময়ে পেয়েছেন নাট্য, সামাজিক ও মানবিক সংগঠনের পক্ষ থেকে সম্মাননা ও কৃতজ্ঞতা স্মারক।

রাজনৈতিক দায়িত্ব পালনের অভিপ্রায়ে তিনি অংশ নেন ময়মনসিংহ সিটি কর্পোরেশনের কাউন্সিলর নির্বাচনে। উদ্দেশ্য ছিল সাংস্কৃতিক নেতৃত্বকে প্রশাসনিক বাস্তবতায় রূপ দেওয়া। কিন্তু নির্বাচনী রাজনীতির জটিলতা, প্রতিহিংসা ও অর্থবলনির্ভর প্রতিদ্বন্দ্বিতায় তাঁর জয় হয়নি।
তবুও তাঁর উপলব্ধি:

> “জনগণের কাছে আমি জিতেছি। এই অভিজ্ঞতা আমাকে নতুনভাবে ভাবতে শিখিয়েছে। আমি এখন শুধু থাকতে চাই একজন মানবিক শিল্পী ও অভিনেতা হিসেবে—কোনো রাজনৈতিক পরিচয়ে নয়।”

এই আত্মসচেতন সিদ্ধান্তের মাধ্যমে তিনি আবারও ফিরে এসেছেন তাঁর মূল জায়গা মঞ্চে। পরিকল্পনা করছেন তাঁর অভিনীত নাটক ‘আই ক্যান্ট ব্রিদ’ নিয়ে দেশের ৬৪ জেলায় ও বিভিন্ন দেশে প্রদর্শনী করার।

মোঃ আবুল মনসুর এমন একজন মানুষ, যিনি নিজের আরাম-আয়েশের চেয়ে বড় করে দেখেন মানুষের জন্য কিছু করার দায়িত্বকে। তাঁর জীবনে সংস্কৃতি, সাংবাদিকতা ও জনসেবার যে আন্তঃসম্পর্ক, তা আজকের সময়েও এক গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।

তিনি বলেন:

“শিল্প কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়—এটি দায়িত্ব পালনের ভাষা। একজন নাট্যকর্মী যত না সংলাপ বলেন, তার চেয়ে বেশি সমাজকে আয়না দেখান।”

আবুল মনসুর সেই আয়নার নির্মাতা, যার সামনে দাঁড়িয়ে সমাজ নিজেকে একটু গভীরভাবে চিনে নিতে পারে।