নান্দাইলের তারঘাটে পাথর ভাঙার মেশিন বন্ধ: অবস্থান কর্মসূচি ও মানব বন্ধনে ঘোষণা আইনের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে টিকে থাকতে চায় শ্রমজীবী মানুষ ও ব্যবসায়ীরা
- আপডেট সময় : ১১:১২:০৪ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৬ অগাস্ট ২০২৫
- / 210
ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলার মুশুলী ইউনিয়নের তারেরঘাট এলাকায় পাথর মহালের ২৯টি পাথর ভাঙার মেশিন সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিয়েছে উপজেলা প্রশাসন। পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র না থাকায় গত ২৩ জুলাই পরিচালিত এক ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। অভিযানে পাথর ব্যবসায়ী সমিতিকে এক লাখ টাকা জরিমানা এবং বেশ কিছু যন্ত্রপাতি ও পাথর জব্দ করা হয়।
এই প্রশাসনিক পদক্ষেপ ঘিরে এলাকায় যেমন আইনের প্রয়োগ নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে, তেমনি মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকেও গভীর উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। কারণ, তারেরঘাট কেন্দ্রিক পাথর মহাল ঘিরেই জীবিকা নির্বাহ করেন অসংখ্য শ্রমিক ও পরিবার—যাদের মধ্যে আছেন দিনমজুর, গাড়িচালক, হেলপার, লেবার ও খুচরা ব্যবসায়ী।
ব্যবসায়ী সমিতির অবস্থান: নিয়ম মানতে প্রস্তুত, চাই সময় ও সহানুভূতি
পাথর ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. হাবিবুর রহমান বাচ্চু বলেন:
> “আমরা আইন মেনে ব্যবসা করতে চাই। পরিবেশ ছাড়পত্র পাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত করেছি এবং আবেদন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। কিন্তু আমাদের মালামাল জব্দ করে হঠাৎ নিলামে তোলা হলে আমরা স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবো। এর সঙ্গে জড়িত শ্রমিকদেরও কর্মহীন হয়ে অনাহারে দিন কাটাতে হবে।”
স্থানীয় ব্যবসায়ী রায়হান আহমেদ অভিযোগ করেন:
> “জরিমানার টাকা আমরা পরিশোধ করেছি। পরিবেশ ছাড়পত্র নেওয়ার প্রক্রিয়াও চলছে। অথচ কোনো সময় না দিয়েই মালামাল জব্দ করে নিলামে তোলা হচ্ছে—এটা সম্পূর্ণ অন্যায়। আমরা চেয়েছিলাম আমাদের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য সময় দেওয়া হোক, কিন্তু তা দেওয়া হয়নি।”
পাথর ব্যাবসায়ী সমিতির কোষাধ্যক্ষ আনিসুর রহমান অভিযোগ করেন : উনারা যে আমাদের মালামাল জব্দ করেছেন সেটার কোন কাগজ কেন দেওয়া হয়নি?? আমরা ইতিমধ্যে মহামান্য হাইকোর্ট থেকে এই জব্দের স্টে অর্ডার এনেছি আশাবাদী প্রশাসন আমাদের মালামাল আমাদের মাঝে ফিরিয়ে দেবেন।
তিনি আরও বলেন:
> “আমরা নিয়ম মানতেই প্রস্তুত, প্রশাসন কেবল আমাদের কাগজপত্র যাচাই করুক, সেই সুযোগটুকু দিক।”
জানা গেছে, ইতোমধ্যে গত ২৭ জুলাই তিনটি জাতীয় দৈনিকে জব্দকৃত মালামাল নিলামের বিজ্ঞপ্তিও প্রকাশ করা হয়েছে, যা নিয়ে ব্যবসায়ী ও শ্রমিক মহলে চরম উদ্বেগ বিরাজ করছে।
শ্রমজীবীদের আর্তি: ‘খাবার চাই, শান্তিপূর্ণ সমাধান চাই’
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, মেশিন বন্ধ থাকায় শ্রমিকরা বেকার অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। অনেকেই পরিবার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন।
শ্রমিক রফিকুল ইসলাম বলেন:
> “আমরা জানি পরিবেশ রক্ষা জরুরি, কিন্তু হঠাৎ কাজ বন্ধ হয়ে গেলে আমাদের খাবার জোটে না। আগে তো বাঁচতে হবে তারপর তো নিয়ম মানা যাবে।”
স্থানীয় বৃদ্ধ শ্রমিক সোলেমান মিয়া বলেন:
> “এই বয়সে আর কোথায় যাব? পাথর না ভাঙলে খামু কী? প্রশাসনের কাছে হাতজোড় করে বলি—দয়া করে একটু সময় দিন।”
একইভাবে মহিলা শ্রমিক রেহেনা বেগম বলেন:
> “আমি প্রতিদিনের মজুরিতে সংসার চালাই। এখন কাজ নেই। প্রশাসনের প্রতি অনুরোধ, যেন আমরা নিয়ম মেনে আবার কাজে ফিরতে পারি।”
প্রশাসনের বক্তব্য: আইন প্রয়োগে মানবিকতা বজায় রাখা হবে
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সারমিনা সাত্তার জানান:
> “পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমতি ছাড়া যন্ত্রচালিত পাথর ভাঙা কার্যক্রম আইনবিরুদ্ধ। তবে আমরা শ্রমিকদের স্বাভাবিক, হাতে পাথর ভাঙা বা লোড-আনলোডের বৈধ কাজ বন্ধ করিনি।”
তিনি বলেন:
“আমাদের উদ্দেশ্য দমন নয়, বরং নিয়মের মধ্যে থেকেই সবাইকে নিয়ে চলা। যারা পরিবেশ ছাড়পত্র সংগ্রহ করবেন, তারা নিয়ম মেনে পুনরায় কাজ শুরু করতে পারবেন।”সমাধানের পথ: আলোচনার মাধ্যমে টেকসই পথ খুঁজে বের করা জরুরি স্থানীয় পাথর ব্যাবসায়ী মালিক সমিতির ক্যাশিয়ার মো: আনিসুর রহমান জানান :“আমরা প্রশাসনের আইনি অবস্থানকে সম্মান করি। তবে শ্রমজীবী মানুষের বাস্তব দুর্দশাও অবহেলা করা যাবে না। উনারা আমাদের কি পরিমান মালামাল জব্দ করেছেন সেই কাগজ এখনো দেয়নি, আমরা ইতোমধ্যে মহামান্য হাইকোর্ট থেকে জব্দ মালামালের স্টে অর্ডার এনেছি আশাবাদী প্রশাসন আলোচনার মাধ্যমেই শান্তিপূর্ণ সমাধান খুঁজে বের করবে।”এদিকে তারেরঘাটে আজ ৬ আগস্ট সকালে ব্যবসায়ী ও শ্রমিকদের অংশগ্রহণে একটি শান্তিপূর্ণ অবস্থান ও মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে তারা দাবি তোলেন: অবিলম্বে মালামাল নিলামে তোলার প্রক্রিয়া স্থগিত রেখে পাথর ব্যবসা নিয়মতান্ত্রিকভাবে চালাতে প্রশাসনের সহায়তা প্রদান করে শ্রমিকদের জন্য অন্তর্বর্তীকালীন বিকল্প কর্মব্যবস্থা বা সহযোগিতা নিশ্চিত করা হোক। উপজেলা জামায়াতী ইসলামের আমির কাজী শামসুদ্দিন এর কথার আশ্বাসে তারা কর্মসূচী স্থগিত করেন কিন্তু যদি দাবী না মানা হয় তবে বৃহত্তর কর্মসূচি দেবেন বলে ঘোষণা করেন।
মানুষ যেন আইনের বলি না হয়
স্থানীয় শিক্ষক আয়েস উদ্দিন বলেন: “নান্দাইলের তারেরঘাট এখন দাঁড়িয়ে আছে একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে একদিকে পরিবেশ রক্ষার আইন, অন্যদিকে মানুষ ও জীবিকার অস্তিত্ব রক্ষা। এখানে প্রশাসনের যেমন দায়িত্ব আছে, তেমনি ব্যবসায়ী ও শ্রমিকদেরও দায়িত্বশীলভাবে নিয়ম মানার প্রস্তুতি আছে।”
সুধীজনেরা বলছেন; আইন, মানবতা ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার সমন্বয় ঘটিয়ে একটি টেকসই সমাধান খুঁজে বের করা এখন সময়ের দাবি। আলোচনা, সহযোগিতা ও সহমর্মিতার ভিত্তিতেই সম্ভব নান্দাইলের পাথর শিল্পকে একটি পরিবেশবান্ধব, আইনসম্মত ও মানবিক শিল্পখাতে রূপান্তর করা




















