ঢাকা ০৪:৪৬ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৩০ মে ২০২৬, ১৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

১৭ দিনে ১৩ শিশুর মৃত্যু: হামের লক্ষণ, নিউমোনিয়া ও টিকার সংকটে উৎকণ্ঠায় ময়মনসিংহ

অনলাইন ডেস্ক
  • আপডেট সময় : ০২:২৬:২৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৮ মে ২০২৬
  • / 46
আজকের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

“জানুয়ারিতে কক্সবাজার গিয়েছিলাম। তখন ঠান্ডা-কাশি কিছুই ছিল না। চার মাস পর হঠাৎ অসুস্থ হয়ে গেল আমার মেয়ে। পিকনিকে গিয়ে যে ছবি তুলেছিলাম, সেটাই এখন শেষ স্মৃতি।”

কথাগুলো বলতে বলতে মোবাইল ফোনে সাত মাস বয়সী মেয়ে সুমাইয়া আক্তারের ছবি দেখাচ্ছিলেন বাবা উজ্জ্বল মিয়া। পাশে মেয়ের ছোট ছোট জামাকাপড় আর হাসপাতালের কাগজপত্র নিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন মা তানজিলা আক্তার।

ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা উপজেলার কুমারগাতা ইউনিয়নের লিচুতলা গ্রামের সিএনজিচালক উজ্জ্বল মিয়া ও তানজিলা দম্পতির দ্বিতীয় সন্তান ছিল সুমাইয়া। গত ৮ মে তাকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়। তিন দিন পর, ১১ মে ভোর ৫টা ৫০ মিনিটে তার মৃত্যু হয়।

মৃত্যুসনদে উল্লেখ করা হয়েছে, হামের লক্ষণের পাশাপাশি নিউমোনিয়া ও হার্ট ফেইলরের কারণে শিশুটির মৃত্যু হয়েছে।

সময়মতো টিকা না পাওয়ার অভিযোগ

সন্তান হারানোর শোক কাটিয়ে উঠতে পারেনি পরিবারটি। মা তানজিলা আক্তারের অভিযোগ, সময়মতো টিকা না পাওয়ায় মেয়ের শারীরিক অবস্থা জটিল হয়ে ওঠে।

তিনি বলেন, “টিকা দিতে গেলে বলত টিকা নাই। দুই মাস ঘুরেছি। সময়মতো টিকা দিতে পারলে আমার বাচ্চা হয়তো নিউমোনিয়ায় মারা যেত না।”

স্বাস্থ্য বিভাগের টিকা রেজিস্টার সূত্রে জানা গেছে, জন্মের পর বিসিজি টিকা পেলেও পরবর্তী টিকাগুলো নির্ধারিত সময়ে পায়নি সুমাইয়া। পেন্টাভ্যালেন্ট টিকার দ্বিতীয় ও তৃতীয় ডোজ নির্ধারিত সময়ের অনেক পরে দেওয়া হয়। একইভাবে নিউমোনিয়া প্রতিরোধী পিসিভি টিকার তৃতীয় ডোজেও বিলম্ব হয়েছে।

পরিবারটির দাবি, টিকার কার্ড সংকটের কারণেও ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে।

এলাকার দায়িত্বপ্রাপ্ত থানা স্বাস্থ্য সহকারী নওরীদ শারমিন বলেন, “সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে পর্যাপ্ত ভ্যাকসিন সরবরাহ না পাওয়া। বাচ্চাটি টিকা পেয়েছে, তবে নির্ধারিত সময়ে না। ২০২৪ সালের মাঝামাঝি থেকেই টিকার সংকট চলছে।”

একের পর এক শিশুমৃত্যু

মুক্তাগাছার খামারের বাজার এলাকার আলমগীর হোসেনের সাত মাস বয়সী ছেলে সোলাইমান ১০ মে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ২০ ঘণ্টার মধ্যেই মারা যায়। তার মৃত্যুসনদেও হামের লক্ষণের পাশাপাশি নিউমোনিয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

একইভাবে ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার কদুখালী গ্রামের কৃষক মামুন মিয়ার ১০ মাস বয়সী ছেলে মো. হোসাইনও চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়। মামুন মিয়া বলেন, “প্রথমে জ্বর-ঠান্ডা ছিল। পরে হাম ধরা পড়ে। নিউমোনিয়ায় খুব কষ্ট করছিল। অসুস্থ থাকায় হামের টিকা দিতে পারিনি।”

১৭ দিনে ১৩ শিশুর মৃত্যু

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, ১ মে থেকে রোববার সকাল পর্যন্ত হামের লক্ষণ নিয়ে ১৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। প্রত্যেকের মৃত্যুসনদে হামের পাশাপাশি নিউমোনিয়ার উল্লেখ রয়েছে।

হাসপাতাল সূত্র জানায়, চলতি বছরের ১৭ মার্চ থেকে ১৭ মে পর্যন্ত হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে মোট ৩৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে ভর্তি হয়েছে ১ হাজার ৩৯২ শিশু। এর মধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ১ হাজার ২৫৩ শিশু এবং বর্তমানে চিকিৎসাধীন রয়েছে ১০৬ শিশু।

হাসপাতালের হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, সন্তানদের নিয়ে উদ্বিগ্ন অভিভাবকদের ভিড়। গুরুতর অসুস্থ শিশুদের ‘বাবল সিপ্যাপ’ পদ্ধতিতে অক্সিজেন সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।

জামালপুরের সুমী আক্তার বলেন, “ঠিকমতো টিকা দিতে পারিনি। ডাক্তার বলছে আইসিইউ লাগবে, কিন্তু এখানে শিশুদের জন্য আইসিইউ নেই।”

নিউমোনিয়ার টিকার মজুত নেই

জেলার ১৩ উপজেলার ৫১০টি টিকাদান কেন্দ্রের মাধ্যমে শিশুদের টিকা দেওয়া হলেও জেলা ইপিআই স্টোরে বর্তমানে নিউমোনিয়া প্রতিরোধী পিসিভি টিকার কোনো মজুত নেই।

জেলা ইপিআই স্টোরের ইনচার্জ মো. ফারুকুল ইসলাম বলেন, “প্রায় এক মাস ধরে পিসিভি টিকার মজুত নেই। ঢাকাতেও এই টিকা সংকট রয়েছে। ২০২৩ সালের শেষ দিক থেকে সরবরাহে সমস্যা শুরু হয়েছে।”

চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণ

হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডের ফোকাল পারসন মোহা. গোলাম মাওলা বলেন, “হামে আক্রান্ত হলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। তখন নিউমোনিয়াসহ অন্যান্য সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে। নিউমোনিয়ার টিকায় ড্রপআউটও বেশি হয়েছে।”

তিনি আরও বলেন, অপুষ্টির কারণেও শিশুদের জটিলতা বাড়ছে। শিশুদের জন্য আইসিইউ না থাকায় গুরুতর রোগীদের ঢাকায় পাঠাতে হচ্ছে।

স্বাস্থ্য বিভাগের ব্যাখ্যা

ময়মনসিংহের ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন ডা. ফয়সাল আহমেদ বলেন, “প্রথমদিকে হামের রোগী বাড়লেও এখন কিছুটা কমছে। তবে হামের পর নিউমোনিয়ার জটিলতায় মৃত্যুঝুঁকি বাড়ছে।”

তিনি আরও বলেন, “দেড় বছর ধরে ভিটামিন এ প্লাস ক্যাম্পেইন বন্ধ থাকাও পরিস্থিতির একটি কারণ হতে পারে। টিকার সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ ছিল না, তবে অনিয়মিত ছিল।”

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

১৭ দিনে ১৩ শিশুর মৃত্যু: হামের লক্ষণ, নিউমোনিয়া ও টিকার সংকটে উৎকণ্ঠায় ময়মনসিংহ

আপডেট সময় : ০২:২৬:২৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৮ মে ২০২৬

“জানুয়ারিতে কক্সবাজার গিয়েছিলাম। তখন ঠান্ডা-কাশি কিছুই ছিল না। চার মাস পর হঠাৎ অসুস্থ হয়ে গেল আমার মেয়ে। পিকনিকে গিয়ে যে ছবি তুলেছিলাম, সেটাই এখন শেষ স্মৃতি।”

কথাগুলো বলতে বলতে মোবাইল ফোনে সাত মাস বয়সী মেয়ে সুমাইয়া আক্তারের ছবি দেখাচ্ছিলেন বাবা উজ্জ্বল মিয়া। পাশে মেয়ের ছোট ছোট জামাকাপড় আর হাসপাতালের কাগজপত্র নিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন মা তানজিলা আক্তার।

ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা উপজেলার কুমারগাতা ইউনিয়নের লিচুতলা গ্রামের সিএনজিচালক উজ্জ্বল মিয়া ও তানজিলা দম্পতির দ্বিতীয় সন্তান ছিল সুমাইয়া। গত ৮ মে তাকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়। তিন দিন পর, ১১ মে ভোর ৫টা ৫০ মিনিটে তার মৃত্যু হয়।

মৃত্যুসনদে উল্লেখ করা হয়েছে, হামের লক্ষণের পাশাপাশি নিউমোনিয়া ও হার্ট ফেইলরের কারণে শিশুটির মৃত্যু হয়েছে।

সময়মতো টিকা না পাওয়ার অভিযোগ

সন্তান হারানোর শোক কাটিয়ে উঠতে পারেনি পরিবারটি। মা তানজিলা আক্তারের অভিযোগ, সময়মতো টিকা না পাওয়ায় মেয়ের শারীরিক অবস্থা জটিল হয়ে ওঠে।

তিনি বলেন, “টিকা দিতে গেলে বলত টিকা নাই। দুই মাস ঘুরেছি। সময়মতো টিকা দিতে পারলে আমার বাচ্চা হয়তো নিউমোনিয়ায় মারা যেত না।”

স্বাস্থ্য বিভাগের টিকা রেজিস্টার সূত্রে জানা গেছে, জন্মের পর বিসিজি টিকা পেলেও পরবর্তী টিকাগুলো নির্ধারিত সময়ে পায়নি সুমাইয়া। পেন্টাভ্যালেন্ট টিকার দ্বিতীয় ও তৃতীয় ডোজ নির্ধারিত সময়ের অনেক পরে দেওয়া হয়। একইভাবে নিউমোনিয়া প্রতিরোধী পিসিভি টিকার তৃতীয় ডোজেও বিলম্ব হয়েছে।

পরিবারটির দাবি, টিকার কার্ড সংকটের কারণেও ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে।

এলাকার দায়িত্বপ্রাপ্ত থানা স্বাস্থ্য সহকারী নওরীদ শারমিন বলেন, “সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে পর্যাপ্ত ভ্যাকসিন সরবরাহ না পাওয়া। বাচ্চাটি টিকা পেয়েছে, তবে নির্ধারিত সময়ে না। ২০২৪ সালের মাঝামাঝি থেকেই টিকার সংকট চলছে।”

একের পর এক শিশুমৃত্যু

মুক্তাগাছার খামারের বাজার এলাকার আলমগীর হোসেনের সাত মাস বয়সী ছেলে সোলাইমান ১০ মে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ২০ ঘণ্টার মধ্যেই মারা যায়। তার মৃত্যুসনদেও হামের লক্ষণের পাশাপাশি নিউমোনিয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

একইভাবে ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার কদুখালী গ্রামের কৃষক মামুন মিয়ার ১০ মাস বয়সী ছেলে মো. হোসাইনও চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়। মামুন মিয়া বলেন, “প্রথমে জ্বর-ঠান্ডা ছিল। পরে হাম ধরা পড়ে। নিউমোনিয়ায় খুব কষ্ট করছিল। অসুস্থ থাকায় হামের টিকা দিতে পারিনি।”

১৭ দিনে ১৩ শিশুর মৃত্যু

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, ১ মে থেকে রোববার সকাল পর্যন্ত হামের লক্ষণ নিয়ে ১৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। প্রত্যেকের মৃত্যুসনদে হামের পাশাপাশি নিউমোনিয়ার উল্লেখ রয়েছে।

হাসপাতাল সূত্র জানায়, চলতি বছরের ১৭ মার্চ থেকে ১৭ মে পর্যন্ত হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে মোট ৩৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে ভর্তি হয়েছে ১ হাজার ৩৯২ শিশু। এর মধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ১ হাজার ২৫৩ শিশু এবং বর্তমানে চিকিৎসাধীন রয়েছে ১০৬ শিশু।

হাসপাতালের হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, সন্তানদের নিয়ে উদ্বিগ্ন অভিভাবকদের ভিড়। গুরুতর অসুস্থ শিশুদের ‘বাবল সিপ্যাপ’ পদ্ধতিতে অক্সিজেন সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।

জামালপুরের সুমী আক্তার বলেন, “ঠিকমতো টিকা দিতে পারিনি। ডাক্তার বলছে আইসিইউ লাগবে, কিন্তু এখানে শিশুদের জন্য আইসিইউ নেই।”

নিউমোনিয়ার টিকার মজুত নেই

জেলার ১৩ উপজেলার ৫১০টি টিকাদান কেন্দ্রের মাধ্যমে শিশুদের টিকা দেওয়া হলেও জেলা ইপিআই স্টোরে বর্তমানে নিউমোনিয়া প্রতিরোধী পিসিভি টিকার কোনো মজুত নেই।

জেলা ইপিআই স্টোরের ইনচার্জ মো. ফারুকুল ইসলাম বলেন, “প্রায় এক মাস ধরে পিসিভি টিকার মজুত নেই। ঢাকাতেও এই টিকা সংকট রয়েছে। ২০২৩ সালের শেষ দিক থেকে সরবরাহে সমস্যা শুরু হয়েছে।”

চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণ

হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডের ফোকাল পারসন মোহা. গোলাম মাওলা বলেন, “হামে আক্রান্ত হলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। তখন নিউমোনিয়াসহ অন্যান্য সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে। নিউমোনিয়ার টিকায় ড্রপআউটও বেশি হয়েছে।”

তিনি আরও বলেন, অপুষ্টির কারণেও শিশুদের জটিলতা বাড়ছে। শিশুদের জন্য আইসিইউ না থাকায় গুরুতর রোগীদের ঢাকায় পাঠাতে হচ্ছে।

স্বাস্থ্য বিভাগের ব্যাখ্যা

ময়মনসিংহের ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন ডা. ফয়সাল আহমেদ বলেন, “প্রথমদিকে হামের রোগী বাড়লেও এখন কিছুটা কমছে। তবে হামের পর নিউমোনিয়ার জটিলতায় মৃত্যুঝুঁকি বাড়ছে।”

তিনি আরও বলেন, “দেড় বছর ধরে ভিটামিন এ প্লাস ক্যাম্পেইন বন্ধ থাকাও পরিস্থিতির একটি কারণ হতে পারে। টিকার সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ ছিল না, তবে অনিয়মিত ছিল।”