জ্বালানি সংকটে রাজধানীতে উধাও ২০ শতাংশ বাস, ভোগান্তিতে যাত্রীরা
- আপডেট সময় : ০২:৩৫:৩৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ২০ এপ্রিল ২০২৬
- / 16
সপ্তাহের প্রথম কর্মদিবস রোববারের ব্যস্ত বিকেল, ঘড়িতে তখন সাড়ে ৫টা। রাজধানীর শাহবাগ মোড়ে বিভিন্ন গন্তব্যের অসংখ্য মানুষ বাসের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছেন। তবে দীর্ঘ অপেক্ষার বিপরীতে মোড়ে গণপরিবহনের উপস্থিতি ছিল একেবারেই নগণ্য। প্রতিটি বাসই ছিল যাত্রীতে কানায় কানায় পূর্ণ। ফলে দাঁড়িয়ে থাকা বিপুল সংখ্যক যাত্রীর মধ্যে মাত্র কয়েকজন কোনোমতে বাসে উঠতে পারলেও অধিকাংশকেই বিফল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে।
বাসে উঠতে না পেরে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের পুলিশ বক্সের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা তাসলিমা স্বর্ণা নামে এক যাত্রী বলেন, বাসে যে পরিমাণ ভিড়, তাতে উঠতে না পেরে এই বাসটি মিস করলাম। পরের বাসের জন্য কতক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে কে জানে? বেশ কয়েক দিন ধরেই রাস্তায় বাসের সংখ্যা অনেক কম দেখছি।
তিনি বলেন, আগে যেখানে একই সিরিয়ালে বিভিন্ন কোম্পানির ৫-৭টি বাস একে অপরেরসঙ্গে পাল্লা দিত, এখন সেখানে বড়জোর ২-৩টি বাস দেখা যায়। কখনো কখনো মোড়ে মাত্র একটি বাস দাঁড়িয়ে থাকে। হঠাৎ করেই গণপরিবহন কমে যাওয়ায় এখন আমাদের দীর্ঘক্ষণ বাসের জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
তেল সংগ্রহ করতেই চালকদের দিনের বড় একটি অংশ ব্যয় হচ্ছে, ফলে বাসের ট্রিপ সংখ্যা কমে গেছে
ওইদিন সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে বাংলামোটর মোড়ে গিয়ে দেখা যায়, শাহবাগ থেকে আসা লেনে হাতেগোনা মাত্র ৮-১০টি বাস চলাচল করছে। রাস্তায় কিছু ব্যক্তিগত গাড়ি ও মোটরসাইকেলের উপস্থিতি থাকলেও সড়কের বড় একটি অংশই প্রায় ফাঁকা।
বর্তমানে রাজধানীর অধিকাংশ সড়কেই গণপরিবহনের এমন চিত্র নিয়মিত হয়ে দাঁড়িয়েছে। চলতি বছরের মার্চ মাস থেকে দেশজুড়ে চলমান তীব্র জ্বালানি সংকটের প্রভাবে স্থবির হয়ে পড়েছে রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবস্থা। পাম্পগুলোতে ডিজেলের অপেক্ষায় দীর্ঘ লাইন এবং পর্যাপ্ত তেল না পাওয়ায় ঢাকার সড়কগুলো থেকে উধাও হয়ে গেছে প্রায় ২০ শতাংশ বাস। এতে দিনের ব্যস্ত সময়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও বাসে উঠতে পারছেন না যাত্রীরা।
পরিবহন মালিকরা বলছেন, তেল সংগ্রহ করতেই চালকদের দিনের বড় একটি অংশ ব্যয় হচ্ছে, ফলে বাসের ট্রিপ সংখ্যা কমে গেছে।
তেলের জন্য আমাদের অনেক কষ্ট হচ্ছে। গাড়ির তেল নিতেই দিনে ৩-৪ ঘণ্টা সময় চলে যায়। এই সময়ে অন্তত একটি ট্রিপ দেওয়া সম্ভব ছিল, কিন্তু সেটি আমরা পারছি না
বাসচালক বিল্লাল হোসেন
এই পরিস্থিতিতে যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা গণপরিবহনকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে জ্বালানি সরবরাহ এবং দীর্ঘমেয়াদী সমাধান হিসেবে ইলেকট্রিক যানবাহন বা ইভি ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার ওপর জোর দিচ্ছেন। তাদের মতে, রাজধানীর গণপরিবহনে ডিজেলচালিত বাসের বিকল্প নিয়ে ভাবার এটাই উপযুক্ত সময়। ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের ৩০ শতাংশ যানবাহন বিদ্যুতায়নের যে সরকারি পরিকল্পনা রয়েছে, তা বাস্তবায়নে এখন থেকেই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
ঢাকার গুলিস্তান থেকে মানিকগঞ্জের পাটুরিয়া ঘাট রুটে চলাচল করা শুভযাত্রা পরিবহনের একটি বাসের চালক বিল্লাল হোসেন ঢাকা পোস্টকে বলেন, তেলের জন্য আমাদের অনেক কষ্ট হচ্ছে। গাড়ির তেল নিতেই দিনে ৩-৪ ঘণ্টা সময় চলে যায়। এই সময়ে অন্তত একটি ট্রিপ দেওয়া সম্ভব ছিল, কিন্তু সেটি আমরা পারছি না।
রাজধানী ও শহরতলীতে প্রতিদিন প্রায় ৪ হাজার বাস চলাচল করে। বর্তমানে শুধু ডিজেল সংকটের কারণে ২০ শতাংশ বাস কম চলাচল করছে। ফলে সড়কে গাড়ির সংখ্যা কম থাকাটাই স্বাভাবিক
ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. সাইফুল আলম
তিনি বলেন, তেল সংকটের কারণেই সড়কে গাড়ি কম দেখা যাচ্ছে। ফলে যাত্রীরা ভোগান্তিতে পড়ছেন এবং বাধ্য হয়ে গাদাগাদি করে বাসে উঠছেন।
পোস্তগোলা-মালিবাগ-মধ্যবাড্ডা-দিয়াবাড়ি রুটে চলাচল করা রাইদা এন্টারপ্রাইজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মকবুল হোসেন পাটোয়ারী বলেন, তেল সংকটের কথা আর কী বলব! আগে আমাদের গাড়িতে একসঙ্গে ৫ হাজার টাকার তেল নিতে পারতাম, যা দিয়ে ৩টি ট্রিপ দেওয়া যেত। এখন ৫ হাজার টাকার তেল নিতে অন্তত দুটি পাম্পে যেতে হয়। কেউ ৩০০০ বা ৩৫০০ টাকার বেশি তেল দিতে চায় না। এই তেল দিয়ে একটি বাস মাত্র ২টি ট্রিপ দিতে পারে। ফলে প্রতিটি বাসের একটি করে ট্রিপ কমে গেছে।
ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. সাইফুল আলম বলেন, রাজধানী ও শহরতলীতে প্রতিদিন প্রায় ৪ হাজার বাস চলাচল করে। বর্তমানে শুধু ডিজেল সংকটের কারণে ২০ শতাংশ বাস কম চলাচল করছে। ফলে সড়কে গাড়ির সংখ্যা কম থাকাটাই স্বাভাবিক।
গণপরিবহন হিসেবে বাসগুলোকে ফুয়েল স্টেশনগুলোতে অগ্রাধিকার দিতে হবে। ব্যক্তিগত গাড়ির চালকরা ‘প্যানিক বাইং’ (আতঙ্কে কেনা) করলেও বাসের ক্ষেত্রে বিষয়টি ভিন্ন; তাদের প্রতিদিন হাজার হাজার টাকার তেল লাগে। সুতরাং তাদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তেল দিতে হবে। তেল কিনতেই যদি ২-৩ ঘণ্টা সময় ব্যয় হয়, তবে গণপরিবহন সেবা ব্যাহত হবেই
বুয়েটের অধ্যাপক ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ মো. হাদিউজ্জামান
তিনি বলেন, এক ট্রিপ শেষ করেই যদি তেল খুঁজতে হয় এবং তেলের জন্য দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়, তাহলে এই জ্যামের শহরে বাস চলবে কখন আর মানুষকে সেবা দেবে কখন?
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ মো. হাদিউজ্জামান বলেন, গণপরিবহন হিসেবে বাসগুলোকে ফুয়েল স্টেশনগুলোতে অগ্রাধিকার দিতে হবে। ব্যক্তিগত গাড়ির চালকরা ‘প্যানিক বাইং’ (আতঙ্কে কেনা) করলেও বাসের ক্ষেত্রে বিষয়টি ভিন্ন; তাদের প্রতিদিন হাজার হাজার টাকার তেল লাগে। সুতরাং তাদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তেল দিতে হবে। তেল কিনতেই যদি ২-৩ ঘণ্টা সময় ব্যয় হয়, তবে গণপরিবহন সেবা ব্যাহত হবেই।
তিনি পরামর্শ দেন, আধা-সরকারি এবং পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অলস পড়ে থাকা বাসগুলো সড়কে নামানো গেলে সাময়িকভাবে গণপরিবহন সংকট কমানো সম্ভব হবে এবং ব্যক্তিগত গাড়ির ওপর নির্ভরশীলতাও কিছুটা হ্রাস পাবে।
দ্রুত ইভি ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার পরামর্শ দিয়েছেন যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা। ছবি- সংগৃহীত
ভবিষ্যৎ সংকট মোকাবিলায় সরকারকে এখন থেকেই ইলেকট্রিক ভেহিকেলের (ইভি) জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে জানিয়ে এই বিশেষজ্ঞ বলেন, শুধু ইলেকট্রিক বাস বা গাড়ি কেনা নয়, বরং পুরো একটি ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার প্রয়োজন। সরকারের ইলেকট্রিক ভেহিকেল নীতিমালায় ২০৩০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ যানবাহন বিদ্যুতায়নের লক্ষ্য থাকলেও বাস্তবে তা অর্জন করতে হলে এখনই প্রস্তুতি শুরু করতে হবে। কারণ ইলেকট্রিক বাস পরিচালনার জন্য হাই ভোল্টেজ সরঞ্জাম, বিশেষায়িত ওয়ার্কশপ, দক্ষ জনবল এবং চার্জিং স্টেশনের মতো অবকাঠামো অপরিহার্য। এসব প্রস্তুতি ছাড়া শুধু বাস কিনে তা কার্যকরভাবে চালানো সম্ভব হবে না।
তিনি বলেন, ইলেকট্রিক বাস চালু করতে হলে প্রচলিত ব্যবস্থার বাইরে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের সেটআপ প্রয়োজন। তাই নীতিমালার লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে দেরি না করে পরিকল্পিতভাবে কাজ শুরু করা জরুরি।
বর্তমান পরিস্থিতিতে যাত্রীরা চরম ভোগান্তিতে রয়েছেন উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, জ্বালানি সংকটের কারণে অনেকেই ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার করতে পারছেন না, ফলে গণপরিবহনের ওপর চাপ বেড়েছে। কিন্তু সেই তুলনায় বাসের সংখ্যা কম থাকায় সংকট আরও তীব্র হচ্ছে। তাই এই আপৎকালীন সময়ে সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে গণপরিবহনের সংখ্যা বাড়াতে হবে এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অব্যবহৃত বাসগুলো ব্যবহারের উদ্যোগ নিতে হবে।



















