ঢাকা ০৯:৩৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩০ মে ২০২৬, ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

না ফেরার দেশে শামস সুমন: কণ্ঠের মায়া, সংগ্রামের উত্তরাধিকার, অপূর্ণতার এক জীবনগাথা

অনলাইন ডেস্ক
  • আপডেট সময় : ০৬:২১:০৯ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৮ মার্চ ২০২৬
  • / 88
আজকের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

বাংলা নাটক ও বাচিক অঙ্গনের মেধাবী, কিন্তু সময়ের স্রোতে ধীরে ধীরে আড়ালে চলে যাওয়া শিল্পী শামস সুমন আর নেই। তাঁর বিদায়ে শুধু একজন অভিনেতার প্রস্থান হয়নি—নিঃশব্দে থেমে গেছে এক সংগ্রামী, সচেতন ও গভীর শিল্পীসত্তার পথচলা।
সংগ্রামের উত্তরাধিকার
শামস সুমনের জীবনকে বুঝতে হলে ফিরে তাকাতে হয় তাঁর পারিবারিক ইতিহাসে।
তাঁর বাবা ছিলেন ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় রণাঙ্গনের এক সাহসী সৈনিক। জীবনবাজি রেখে তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে পাকিস্তানি বাহিনী ও দেশীয় রাজাকার, আলবদর, আলশামসের নৃশংসতার তথ্য সংগ্রহ করতেন এবং নিয়মিত বুলেটিন প্রকাশ করতেন।
সেই সাহস, সেই দায়বোধ—রক্তের ভেতর দিয়েই যেন উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছিলেন সুমন।
স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে অকুতভয় কণ্ঠ
নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সময় দেশের প্রথম সারির আবৃত্তি সংগঠনের সদস্য হিসেবে শামস সুমন ছিলেন এক অকুতভয় সৈনিক।
শুধু মঞ্চে নয়, কণ্ঠ দিয়েও প্রতিবাদ গড়ে তুলেছিলেন তিনি। আবৃত্তির ভাষা হয়ে উঠেছিল তাঁর প্রতিরোধের হাতিয়ার।
পরবর্তীতে ২০২৪ সালের কোটাবিরোধী আন্দোলন নিয়েও তিনি ছিলেন স্পষ্টভাষী—যা তাঁর সাহসী নাগরিক সত্তার আরেকটি প্রমাণ।
শৈশবেই শিল্পের শুরু
শৈশবেই অভিনয়ের প্রতি আকর্ষণ জন্ম নেয় তাঁর। রাজশাহী বেতারে স্কুলজীবনেই শুরু হয় তাঁর পথচলা। শিশুতোষ নাটক থেকে বড়দের নাটক—সবখানেই কণ্ঠ দিয়েই নিজের জায়গা তৈরি করেন।
উপস্থাপনা ও সংবাদ পাঠেও ছিলেন সমান দক্ষ।
আকাশবাণীর নাটক শুনতে না দেওয়ার সেই ‘নিষেধ’ই তাঁর কৌতূহল বাড়িয়ে দেয়। দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে শোনা কণ্ঠনাটকই হয়ে ওঠে তাঁর প্রথম অভিনয়-বিদ্যালয়। সেখান থেকেই জগন্নাথ বসু ও শাওলী মিত্রের কণ্ঠ তাঁকে মুগ্ধ করে।
নব্বইয়ের টেলিভিশনের প্রিয় মুখ
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালে ‘স্বনন’ আবৃত্তি সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হন। পরে ঢাকায় এসে চাকরির পাশাপাশি টেলিভিশনে অডিশন দিয়ে শুরু করেন অভিনয়।
নব্বইয়ের দশকে তিনি হয়ে ওঠেন টিভি নাটকের পরিচিত ও জনপ্রিয় মুখ।
‘অহংকার’, ‘অনুরাগ’, ‘যদি ভালোবাসো’, ‘এইতো আমাদের বাড়ি’, ‘রাতের অতিথি’, ‘অতন্দ্র প্রহর’, ‘খোঁজ’সহ অসংখ্য নাটকে অভিনয় করেন।
একুশে টেলিভিশনের ধারাবাহিক ‘বন্ধন’-এ তাঁর অভিনয় বিশেষভাবে দর্শকপ্রিয়তা পায়।
চলচ্চিত্রেও রেখেছেন শক্ত অবস্থান। ‘জয়যাত্রা’, ‘বিদ্রোহী পদ্মা’, ‘জোনাকির আলো’, ‘আয়না কাহিনি’, ‘প্রিয়া তুমি সুখী হও’, ‘চোখের দেখা’, ‘মন জানে না মনের ঠিকানা’সহ একাধিক ছবিতে অভিনয় করেন। সর্বশেষ ‘মিশন এক্সট্রিম’-এ ছোট চরিত্রে দেখা যায় তাঁকে।
শহিদুল ইসলাম খোকনের ‘স্বপ্নপূরণ’ ছবিতে অভিনয়ের জন্য অর্জন করেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার—যা তাঁর অভিনয়শক্তির স্বীকৃতি।
সময়ের সঙ্গে দূরত্ব
তবে সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে না পেরে ধীরে ধীরে অভিনয় থেকে সরে যান তিনি।
নিজেই আক্ষেপ করে বলেছিলেন—বর্তমান টিভি, ওটিটি ও ইউটিউবভিত্তিক নাট্যধারার সঙ্গে নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারছেন না। সংলাপ, চরিত্র, কাহিনি—কোনোটাতেই খুঁজে পাননি নিজের শিল্পীসত্তার প্রতিফলন।
তবুও তাঁর ভেতরের আকাঙ্ক্ষা কখনো থামেনি। তিনি বারবার বলেছেন—“ক্যামেরার সামনে আবার দাঁড়াতে চাই।”
অপূর্ণ স্বপ্নের ভার
শামস সুমনের জীবনজুড়ে ছিল কিছু না-পাওয়া।
শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন—মাত্র ২০ নম্বরের জন্য পূরণ হয়নি।
আবৃত্তিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার স্বপ্নও অপূর্ণ থেকে যায়।
জীবিকার তাগিদে তিনি রেডিও ভূমির প্রধান হিসেবে কাজ করেছেন, কিন্তু শিল্পের টান কখনো ছেড়ে যাননি।
এক অসমাপ্ত অধ্যায়ের সমাপ্তি
শামস সুমনের জীবন যেন এক অসমাপ্ত নাটক—যেখানে আছে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সাহস, নিজের অর্জিত খ্যাতি, আর গভীর অপূর্ণতার বেদনা।
তবুও তিনি থেকে যাবেন—
নব্বইয়ের টেলিভিশনের সেই পরিচিত মুখ হয়ে,
আর সবচেয়ে বেশি—তাঁর ভরাট, মায়াময় কণ্ঠস্বর হয়ে।
একজন শিল্পী চলে যান, কিন্তু তাঁর কণ্ঠ, তাঁর উচ্চারণ, তাঁর প্রতিবাদ—চিরকাল প্রতিধ্বনিত হয় সময়ের ভেতর।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

না ফেরার দেশে শামস সুমন: কণ্ঠের মায়া, সংগ্রামের উত্তরাধিকার, অপূর্ণতার এক জীবনগাথা

আপডেট সময় : ০৬:২১:০৯ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৮ মার্চ ২০২৬

বাংলা নাটক ও বাচিক অঙ্গনের মেধাবী, কিন্তু সময়ের স্রোতে ধীরে ধীরে আড়ালে চলে যাওয়া শিল্পী শামস সুমন আর নেই। তাঁর বিদায়ে শুধু একজন অভিনেতার প্রস্থান হয়নি—নিঃশব্দে থেমে গেছে এক সংগ্রামী, সচেতন ও গভীর শিল্পীসত্তার পথচলা।
সংগ্রামের উত্তরাধিকার
শামস সুমনের জীবনকে বুঝতে হলে ফিরে তাকাতে হয় তাঁর পারিবারিক ইতিহাসে।
তাঁর বাবা ছিলেন ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় রণাঙ্গনের এক সাহসী সৈনিক। জীবনবাজি রেখে তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে পাকিস্তানি বাহিনী ও দেশীয় রাজাকার, আলবদর, আলশামসের নৃশংসতার তথ্য সংগ্রহ করতেন এবং নিয়মিত বুলেটিন প্রকাশ করতেন।
সেই সাহস, সেই দায়বোধ—রক্তের ভেতর দিয়েই যেন উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছিলেন সুমন।
স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে অকুতভয় কণ্ঠ
নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সময় দেশের প্রথম সারির আবৃত্তি সংগঠনের সদস্য হিসেবে শামস সুমন ছিলেন এক অকুতভয় সৈনিক।
শুধু মঞ্চে নয়, কণ্ঠ দিয়েও প্রতিবাদ গড়ে তুলেছিলেন তিনি। আবৃত্তির ভাষা হয়ে উঠেছিল তাঁর প্রতিরোধের হাতিয়ার।
পরবর্তীতে ২০২৪ সালের কোটাবিরোধী আন্দোলন নিয়েও তিনি ছিলেন স্পষ্টভাষী—যা তাঁর সাহসী নাগরিক সত্তার আরেকটি প্রমাণ।
শৈশবেই শিল্পের শুরু
শৈশবেই অভিনয়ের প্রতি আকর্ষণ জন্ম নেয় তাঁর। রাজশাহী বেতারে স্কুলজীবনেই শুরু হয় তাঁর পথচলা। শিশুতোষ নাটক থেকে বড়দের নাটক—সবখানেই কণ্ঠ দিয়েই নিজের জায়গা তৈরি করেন।
উপস্থাপনা ও সংবাদ পাঠেও ছিলেন সমান দক্ষ।
আকাশবাণীর নাটক শুনতে না দেওয়ার সেই ‘নিষেধ’ই তাঁর কৌতূহল বাড়িয়ে দেয়। দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে শোনা কণ্ঠনাটকই হয়ে ওঠে তাঁর প্রথম অভিনয়-বিদ্যালয়। সেখান থেকেই জগন্নাথ বসু ও শাওলী মিত্রের কণ্ঠ তাঁকে মুগ্ধ করে।
নব্বইয়ের টেলিভিশনের প্রিয় মুখ
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালে ‘স্বনন’ আবৃত্তি সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হন। পরে ঢাকায় এসে চাকরির পাশাপাশি টেলিভিশনে অডিশন দিয়ে শুরু করেন অভিনয়।
নব্বইয়ের দশকে তিনি হয়ে ওঠেন টিভি নাটকের পরিচিত ও জনপ্রিয় মুখ।
‘অহংকার’, ‘অনুরাগ’, ‘যদি ভালোবাসো’, ‘এইতো আমাদের বাড়ি’, ‘রাতের অতিথি’, ‘অতন্দ্র প্রহর’, ‘খোঁজ’সহ অসংখ্য নাটকে অভিনয় করেন।
একুশে টেলিভিশনের ধারাবাহিক ‘বন্ধন’-এ তাঁর অভিনয় বিশেষভাবে দর্শকপ্রিয়তা পায়।
চলচ্চিত্রেও রেখেছেন শক্ত অবস্থান। ‘জয়যাত্রা’, ‘বিদ্রোহী পদ্মা’, ‘জোনাকির আলো’, ‘আয়না কাহিনি’, ‘প্রিয়া তুমি সুখী হও’, ‘চোখের দেখা’, ‘মন জানে না মনের ঠিকানা’সহ একাধিক ছবিতে অভিনয় করেন। সর্বশেষ ‘মিশন এক্সট্রিম’-এ ছোট চরিত্রে দেখা যায় তাঁকে।
শহিদুল ইসলাম খোকনের ‘স্বপ্নপূরণ’ ছবিতে অভিনয়ের জন্য অর্জন করেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার—যা তাঁর অভিনয়শক্তির স্বীকৃতি।
সময়ের সঙ্গে দূরত্ব
তবে সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে না পেরে ধীরে ধীরে অভিনয় থেকে সরে যান তিনি।
নিজেই আক্ষেপ করে বলেছিলেন—বর্তমান টিভি, ওটিটি ও ইউটিউবভিত্তিক নাট্যধারার সঙ্গে নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারছেন না। সংলাপ, চরিত্র, কাহিনি—কোনোটাতেই খুঁজে পাননি নিজের শিল্পীসত্তার প্রতিফলন।
তবুও তাঁর ভেতরের আকাঙ্ক্ষা কখনো থামেনি। তিনি বারবার বলেছেন—“ক্যামেরার সামনে আবার দাঁড়াতে চাই।”
অপূর্ণ স্বপ্নের ভার
শামস সুমনের জীবনজুড়ে ছিল কিছু না-পাওয়া।
শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন—মাত্র ২০ নম্বরের জন্য পূরণ হয়নি।
আবৃত্তিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার স্বপ্নও অপূর্ণ থেকে যায়।
জীবিকার তাগিদে তিনি রেডিও ভূমির প্রধান হিসেবে কাজ করেছেন, কিন্তু শিল্পের টান কখনো ছেড়ে যাননি।
এক অসমাপ্ত অধ্যায়ের সমাপ্তি
শামস সুমনের জীবন যেন এক অসমাপ্ত নাটক—যেখানে আছে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সাহস, নিজের অর্জিত খ্যাতি, আর গভীর অপূর্ণতার বেদনা।
তবুও তিনি থেকে যাবেন—
নব্বইয়ের টেলিভিশনের সেই পরিচিত মুখ হয়ে,
আর সবচেয়ে বেশি—তাঁর ভরাট, মায়াময় কণ্ঠস্বর হয়ে।
একজন শিল্পী চলে যান, কিন্তু তাঁর কণ্ঠ, তাঁর উচ্চারণ, তাঁর প্রতিবাদ—চিরকাল প্রতিধ্বনিত হয় সময়ের ভেতর।