ময়মনসিংহে ‘Star75’ এর মতো অসংখ্য অনলাইন ক্যাসিনো সাইটের নীল দংশনে পথে বসছে হাজারো পরিবার, পাচার হচ্ছে কোটি কোটি টাকা
- আপডেট সময় : ১০:০৭:৩৮ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১২ মে ২০২৬
- / 38
নিজস্ব প্রতিবেদক | ময়মনসিংহ
ব্রহ্মপুত্রের শান্ত জনপদে এখন এক অশান্ত আগ্নেয়গিরির নাম ‘অনলাইন জুয়া’। বিশেষ করে ‘Star75’ এর মতো আড়াইশ’র বেশি ক্লোন সাইট ও অ্যাপের নীল দংশনে নীল হয়ে যাচ্ছে ময়মনসিংহের তারুণ্য। নগরের গাঙ্গিনারপাড়ের অভিজাত এলাকা থেকে শুরু করে নান্দাইল, ঈশ্বরগঞ্জ, গৌরীপুর ও মুক্তাগাছার প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত ক্যান্সার স্টাইলে ছড়িয়ে পড়েছে এই মরণব্যাধি। স্মার্টফোনের স্ক্রিনে কয়েকটা ক্লিকেই কোটিপতি হওয়ার হাতছানি আসলে যে এক অন্ধকার গহ্বর, তা বুঝতে বুঝতেই সর্বস্বান্ত হচ্ছে শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে নিম্ন আয়ের মানুষ।
নান্দাইল উপজেলার কলেজছাত্র আকাশ (ছদ্মনাম) এখন এলাকাছাড়া। তার অপরাধ, তিনি ‘Star75’ অ্যাপের মরণফাঁদে পা দিয়েছিলেন। আকাশ বলেন, “৫০০ টাকা দিয়ে শুরু করে প্রথম দিনই ২ হাজার টাকা জিতি। একপর্যায়ে লাখ টাকাও জিতেছিলাম। মনে হয়েছিল এটাই আলাদিনের চেরাগ! কিন্তু সেই নেশায় বাবার টাকা চুরি আর ল্যাপটপ বিক্রি করে আজ আমি নিঃস্ব ও ফেরারি।”
একই আর্তনাদ গৌরীপুরের এক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর। দোকানের মালামাল তোলার ৫০ হাজার টাকা কয়েক মিনিটের ‘বেটিং’ বা বাজিতে খুইয়েছেন তিনি। আজ পাওনাদারদের ভয়ে নিজের ভিটেমাটিতেই তিনি পরবাসী। তার ভাষায়, “এই খেলা আমার সাজানো সংসারটাকে শ্মশান বানিয়ে দিয়েছে।”

ঈশ্বরগঞ্জের উপজেলার বেশ কয়েকজন যুবক এলাকাবাসীর চোখে ‘সফল’ দাবি করলেও তাদের ফ্যাকাসে চেহারা আর চোখের নিচের কালো দাগ বলে দেয় ভিন্ন কথা। তারা স্বীকার করেন, “টাকা কিছু আসে ঠিকই, কিন্তু যে মানসিক যন্ত্রণা আর রাত জাগা লাগে, তাতে শরীর শেষ হয়ে যাচ্ছে। এই টাকা হাতে থাকে না।” উল্টো এখন তারা ব্ল্যাকমেইল ও নানা শত্রুতার শিকার হচ্ছেন।
অনুসন্ধানে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। পুলিশি গ্রেপ্তার এড়াতে ঈশ্বরগঞ্জে এখন এজেন্ট হিসেবে পরিবারের নারীদের (স্ত্রী বা সদস্য) ব্যবহার করা হচ্ছে। খোদ ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার পৌর এলাকা ও ১১টি ইউনিয়নে প্রায় ৬ শতাধিক এজেন্ট সক্রিয় রয়েছে। এরা রাশিয়া, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া থেকে পরিচালিত এই জুয়া সিন্ডিকেটের হয়ে মাঠ পর্যায়ে কাজ করছে। ডিজিটাল হুন্ডির মাধ্যমে ময়মনসিংহের সাধারণ মানুষের পকেট কেটে কোটি কোটি টাকা বিদেশে পাচার হচ্ছে।
সমাজ রূপান্তর সাংস্কৃতিক সংঘের সভাপতি ইমতিয়াজ আহমেদ তানসেন বিষয়টিকে ‘সামাজিক মহামারী’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি ক্ষোভের সাথে বলেন, “Star75 এর মতো অন্তত ২৫০টি ক্লোন সাইট এখন সক্রিয় এগুলোর কারনে আমাদের মেধাবী তরুণরা আজ শ্রমবিমুখ হয়ে ‘শর্টকাট’ পথে নামছে। এটি জাতীয় নিরাপত্তার জন্যও বড় হুমকি।
অতি দ্রুত সর্বপ্রশাসনকে কঠোর হওয়ার অনুরোধ করছি, প্রজন্মকে খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে সংযুক্ত না করলে এই নেশা থেকে তাদের মুক্ত করা কঠিন।”
এক উদ্বেগকণ্ঠী মা তার ছেলের অবক্ষয় দেখে বাকরুদ্ধ। তিনি বলেন, “ছেলেটা সারারাত মোবাইলের আলোয় কী যেন খেলে। খাওয়ার নেশা নেই, ঘুমের বালাই নেই। শাসন করতে গেলে মারমুখী হয়ে ওঠে। ও কখন কোনো বড় অপরাধে জড়িয়ে পড়ে বা নিজের ক্ষতি করে বসে সেই আতঙ্কে দিন কাটছে আমাদের।”
ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসক মো: সাইফুর রহমান বলেন, “অনলাইন ক্যাসিনোর মাত্রা শহর থেকে গ্রামের নির্দিষ্ট ঘরে পর্যন্ত ছড়িয়ে গেছে। আমরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মাধ্যমে নজরদারির চেষ্টা করছি। সঠিক তথ্য ও প্রমাণ পেলে আমরা কঠোর ব্যবস্থা নেব।”
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো: আব্দুল্লাহ আল মামুন অত্যন্ত কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী জুয়া এবং অনলাইন জুয়ার ব্যাপারে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে। তিনি বলেন, “আমরা ইতোমধ্যে সাইবার ক্রাইম ইউনিটের মাধ্যমে অবৈধ অ্যাপ ও সাইটগুলোর তালিকা তৈরি করেছি। যারা ‘লোকাল এজেন্ট’ বা ডিলার হিসেবে কাজ করছে এবং ডিজিটাল হুন্ডির মাধ্যমে টাকা লেনদেন করছে, তাদের পরিচয় শনাক্তের কাজ চলমান। সুনির্দিষ্ট তথ্যের মাধ্যমে যার মোবাইলেই এসব অ্যাপ ইনস্টল পাওয়া যাবে, সেটিকেই আলামত হিসেবে নিয়ে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” যাচাই-বাছাই এর কাজ চলমান খুব শীঘ্রই একটি বড় মাপের অভিযানে নামছে পুলিশ।
সাধারণ মানুষের মতে, প্রযুক্তির আড়ালে চলা এই মরণফাঁদ থেকে ময়মনসিংহকে রক্ষা করতে হলে শুধু ওয়েবসাইট ব্লক করা সমাধান নয়। বরং পাড়া-মহল্লায় সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা এবং এই জুয়া সিন্ডিকেটের স্থানীয় হোতাদের সরাসরি আইনের আওতায় আনা এখন সময়ের দাবি।




















