ঢাকা ০৬:৫২ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩০ মে ২০২৬, ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

​সহিংসতার বিপরীতে মানবিক থিয়েটার: মঞ্চের দায় ও আগামীর পথরেখা

অনলাইন ডেস্ক
  • আপডেট সময় : ১২:৪৯:১৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৭ মার্চ ২০২৬
  • / 97
আজকের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

 

 

​বিশ্বজুড়ে যখন আদর্শিক মেরুকরণ, ক্রমবর্ধমান সামাজিক বিভাজন আর অসহিষ্ণুতার বিস্তার ঘটছে, তখন এবারের বিশ্ব নাট্য দিবসের প্রতিপাদ্য “সহিংস বিশ্বের বিপরীতে মানবিক থিয়েটার” একটি নিছক আনুষ্ঠানিক শ্লোগান ছাপিয়ে আমাদের অস্তিত্বের গভীরতম সংকটে কড়া নাড়ছে। এটি কেবল একটি সাংস্কৃতিক আহ্বান নয়, বরং খণ্ড-বিখণ্ড হতে থাকা মানবিক মূল্যবোধগুলোকে শিল্পতাত্ত্বিকভাবে জোড়া দেওয়ার একটি জরুরি নৈতিক আর্তি।

​ইতিহাসের পাতায় চোখ ফেরালে দেখা যায়, রাষ্ট্র ও নাটকের সম্পর্ক সবসময়ই একটি দ্বান্দ্বিক অথচ ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থানে টিকে থাকে। রাষ্ট্র যেখানে সংহতি ও কঠোর শৃঙ্খলার বয়ান তৈরি করে, নাটক সেখানে জন্ম দেয় চিরকালীন প্রশ্ন, সংশয় এবং বিকল্প দর্শনের। নাটকের এই ‘কাউন্টার-ন্যারেটিভ’ বা প্রতি-আখ্যান তৈরির ক্ষমতাই একে সমাজের অতন্দ্র প্রহরীর মর্যাদা দিয়েছে। নীরব বা উপেক্ষিত জনবাস্তবতাকে আলোয় আনাই নাট্যচর্চার চিরায়ত ধর্ম।

​তবে বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে একটি মৌলিক প্রশ্ন আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে সমসাময়িক নাট্যচর্চা কি সেই নির্মোহ ও মানবিক ভূমিকা পালন করতে পারছে?

বাংলাদেশে গত এক দশকের বিবর্তিত ধারায় লক্ষ্য করা যায়, প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং নানাবিধ অদৃশ্য চাপে মঞ্চ নাট্যের বিষয়বস্তুতে এক ধরনের রূপান্তর ঘটেছে। সরাসরি প্রতিবাদ বা তীক্ষ্ণ সামাজিক ব্যবচ্ছেদের পরিবর্তে ‘নিরাপদ’ ও ‘গ্রহণযোগ্য’ বিষয়ের প্রতি ঝোঁক বাড়ছে। ভিন্নমত বা সমালোচনামূলক অবস্থানের বিপরীতে যখন সামাজিক ও পেশাগত চাপ প্রবল হয়ে ওঠে, তখন শিল্পের অন্দরে এক প্রকার ‘সেলফ-সেন্সরশিপ’ বা আত্মসংযমের জন্ম হওয়া অস্বাভাবিক নয়।

​কিন্তু থিয়েটারের আসল শক্তি তো তার বহুমাত্রিকতায়। এটি যেমন নন্দনতত্ত্বের আধার, তেমনি সামাজিক আয়নাও বটে। মঞ্চে যখন আমরা মানবিকতার কথা বলি, তখন আমাদের নিজেদের নাট্য-পরিবেশটি কতটা গণতান্ত্রিক আর সহনশীল, সেটিও ভেবে দেখার অবকাশ আছে।

একটি সুস্থ সাংস্কৃতিক বলয়ে ভিন্নধর্মী চিন্তা আর মতবৈচিত্র্যকে জায়গা দেওয়া সৃজনশীলতার প্রধান শর্ত। মতপার্থক্যকে শত্রুতা হিসেবে নয়, বরং নতুন সৃষ্টির উদ্দীপক হিসেবে গ্রহণ করার সংস্কৃতিই পারে থিয়েটারকে প্রাণবন্ত রাখতে।

​বিশ্ব নাট্য দিবসের এই ক্ষণে আমাদের উপলব্ধি হওয়া প্রয়োজন যে, থিয়েটার কেবল শব্দের কারুকাজ নয়, এটি একটি জীবন্ত সংলাপের মাধ্যম। সহিংসতা আর বিদ্বেষের বিপরীতে থিয়েটার যেন সেই পরিসর হয়ে ওঠে, যেখানে সংলাপের মাধ্যমে মানুষ মানুষকে চিনতে শেখে।

​পরিশেষে বলতে হয়, বর্তমানের জটিল বাস্তবতায় থিয়েটারের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে ভাববার কোনো বিকল্প নেই। আত্মসমালোচনার মাধ্যমে নিজেদের সীমাবদ্ধতা চিহ্নিত করে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, মুক্ত ও দায়িত্বশীল নাট্য-পরিবেশ গড়ে তোলাই হোক আমাদের অঙ্গীকার। সময়ের দাবি মেনেই আমাদের মঞ্চগুলোকে মানবিকতার প্রকৃত দর্পণ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।

​মো: আবুল মনসুর
​নাট্যশ্রমিক ও সভাপতি, অনসাম্বল থিয়েটার, ময়মনসিংহ।
২৭ মার্চ ২০২৬

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

​সহিংসতার বিপরীতে মানবিক থিয়েটার: মঞ্চের দায় ও আগামীর পথরেখা

আপডেট সময় : ১২:৪৯:১৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৭ মার্চ ২০২৬

 

 

​বিশ্বজুড়ে যখন আদর্শিক মেরুকরণ, ক্রমবর্ধমান সামাজিক বিভাজন আর অসহিষ্ণুতার বিস্তার ঘটছে, তখন এবারের বিশ্ব নাট্য দিবসের প্রতিপাদ্য “সহিংস বিশ্বের বিপরীতে মানবিক থিয়েটার” একটি নিছক আনুষ্ঠানিক শ্লোগান ছাপিয়ে আমাদের অস্তিত্বের গভীরতম সংকটে কড়া নাড়ছে। এটি কেবল একটি সাংস্কৃতিক আহ্বান নয়, বরং খণ্ড-বিখণ্ড হতে থাকা মানবিক মূল্যবোধগুলোকে শিল্পতাত্ত্বিকভাবে জোড়া দেওয়ার একটি জরুরি নৈতিক আর্তি।

​ইতিহাসের পাতায় চোখ ফেরালে দেখা যায়, রাষ্ট্র ও নাটকের সম্পর্ক সবসময়ই একটি দ্বান্দ্বিক অথচ ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থানে টিকে থাকে। রাষ্ট্র যেখানে সংহতি ও কঠোর শৃঙ্খলার বয়ান তৈরি করে, নাটক সেখানে জন্ম দেয় চিরকালীন প্রশ্ন, সংশয় এবং বিকল্প দর্শনের। নাটকের এই ‘কাউন্টার-ন্যারেটিভ’ বা প্রতি-আখ্যান তৈরির ক্ষমতাই একে সমাজের অতন্দ্র প্রহরীর মর্যাদা দিয়েছে। নীরব বা উপেক্ষিত জনবাস্তবতাকে আলোয় আনাই নাট্যচর্চার চিরায়ত ধর্ম।

​তবে বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে একটি মৌলিক প্রশ্ন আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে সমসাময়িক নাট্যচর্চা কি সেই নির্মোহ ও মানবিক ভূমিকা পালন করতে পারছে?

বাংলাদেশে গত এক দশকের বিবর্তিত ধারায় লক্ষ্য করা যায়, প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং নানাবিধ অদৃশ্য চাপে মঞ্চ নাট্যের বিষয়বস্তুতে এক ধরনের রূপান্তর ঘটেছে। সরাসরি প্রতিবাদ বা তীক্ষ্ণ সামাজিক ব্যবচ্ছেদের পরিবর্তে ‘নিরাপদ’ ও ‘গ্রহণযোগ্য’ বিষয়ের প্রতি ঝোঁক বাড়ছে। ভিন্নমত বা সমালোচনামূলক অবস্থানের বিপরীতে যখন সামাজিক ও পেশাগত চাপ প্রবল হয়ে ওঠে, তখন শিল্পের অন্দরে এক প্রকার ‘সেলফ-সেন্সরশিপ’ বা আত্মসংযমের জন্ম হওয়া অস্বাভাবিক নয়।

​কিন্তু থিয়েটারের আসল শক্তি তো তার বহুমাত্রিকতায়। এটি যেমন নন্দনতত্ত্বের আধার, তেমনি সামাজিক আয়নাও বটে। মঞ্চে যখন আমরা মানবিকতার কথা বলি, তখন আমাদের নিজেদের নাট্য-পরিবেশটি কতটা গণতান্ত্রিক আর সহনশীল, সেটিও ভেবে দেখার অবকাশ আছে।

একটি সুস্থ সাংস্কৃতিক বলয়ে ভিন্নধর্মী চিন্তা আর মতবৈচিত্র্যকে জায়গা দেওয়া সৃজনশীলতার প্রধান শর্ত। মতপার্থক্যকে শত্রুতা হিসেবে নয়, বরং নতুন সৃষ্টির উদ্দীপক হিসেবে গ্রহণ করার সংস্কৃতিই পারে থিয়েটারকে প্রাণবন্ত রাখতে।

​বিশ্ব নাট্য দিবসের এই ক্ষণে আমাদের উপলব্ধি হওয়া প্রয়োজন যে, থিয়েটার কেবল শব্দের কারুকাজ নয়, এটি একটি জীবন্ত সংলাপের মাধ্যম। সহিংসতা আর বিদ্বেষের বিপরীতে থিয়েটার যেন সেই পরিসর হয়ে ওঠে, যেখানে সংলাপের মাধ্যমে মানুষ মানুষকে চিনতে শেখে।

​পরিশেষে বলতে হয়, বর্তমানের জটিল বাস্তবতায় থিয়েটারের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে ভাববার কোনো বিকল্প নেই। আত্মসমালোচনার মাধ্যমে নিজেদের সীমাবদ্ধতা চিহ্নিত করে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, মুক্ত ও দায়িত্বশীল নাট্য-পরিবেশ গড়ে তোলাই হোক আমাদের অঙ্গীকার। সময়ের দাবি মেনেই আমাদের মঞ্চগুলোকে মানবিকতার প্রকৃত দর্পণ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।

​মো: আবুল মনসুর
​নাট্যশ্রমিক ও সভাপতি, অনসাম্বল থিয়েটার, ময়মনসিংহ।
২৭ মার্চ ২০২৬