চা বাগানের ‘টি-টোকেন’: শোষণের অদৃশ্য মুদ্রা
- আপডেট সময় : ০১:৩৫:১৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৫ অগাস্ট ২০২৫
- / 130
বাংলাদেশের চা বাগান শুধু সবুজ পাহাড়ি ঢাল বা সুগন্ধি পাতার জন্যই পরিচিত নয়। এর আড়ালে লুকিয়ে আছে এক ভয়াবহ ইতিহাস—শ্রমিকদের আর্থিক স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া। ব্রিটিশ শাসনামলে চা শ্রমিকদের মজুরি নগদ অর্থে নয়, বরং বিশেষ ধাতু বা কার্ডবোর্ডের ‘টি-টোকেন’ আকারে দেওয়া হতো।
টি-টোকেন মূলত চা বাগানের মালিকদের
হাতে শ্রমিকদের মজুরি বিতরণের মাধ্যম। নগদ অর্থের বিকল্প হলেও প্রকৃতপক্ষে এটি শ্রমিকদের উপর একটি অদৃশ্য শৃঙ্খল। শ্রমিকরা শুধুমাত্র বাগানের ভেতরের দোকান (যাকে বলা হতো কুলি দোকান) থেকেই নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে পারত। বাইরে এই টোকেনের কোনো মূল্য ছিল না।
ব্রিটিশ শাসনামলে চা বাগানে শ্রমিকদের চুক্তিবদ্ধভাবে আনা হতো ভারতের ঝাড়খণ্ড, ওড়িশা, ছত্তিশগড়সহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে। তারা নতুন পরিবেশে এসে সম্পূর্ণ মালিকের নিয়ন্ত্রণে আবদ্ধ হতো। নগদ অর্থ না থাকায় এবং টোকেন ব্যবহার করে শ্রমিকদের পালিয়ে যাওয়া বা স্বাধীন লেনদেনে বাধা দেওয়া হতো।
টোকেন গুলো তৈরিতে কাঁসা, তামা, জিঙ্ক, টিন অথবা বিকল্প উপাদান হিসেবে কার্ডবোর্ড বা অ্যালুমিনিয়াম ব্যবহার করা হতো। সেগুলোতে বাগানের নাম বা মালিকের চিহ্ন হিসেবে খোদাই করা থাকতো তবে এটির কোনো সরকারি স্বীকৃতি থাকতোনা। মূল্য নির্দেশক হিসেবে আলাদা আলাদা টোকেন থাকতো পুরো হাজিরা হিসেবে এক ধরনের, তিন-চতুর্থাংশ হাজিরা হিসেবে আরেক ধরনের আর আধা হাজিরা হিসেবে থাকতো এক ধরনের টোকেন।
প্রায় ১৮৭০ সালের দিকে ছোট মুদ্রার ঘাটতি এবং শ্রমিক নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনে এই ব্যবস্থা চালু হয়।
শ্রমিকরা হাতে নগদ টাকা না পেয়ে কেবল টোকেন দিয়ে মালিকের দোকান থেকে চাল, ডাল, নুন, তেল কিনতে পারত। পণ্যের দাম প্রায়শই চড়া এবং মানও অনেক সময় নিম্নমানের হতো। একদিকে শারীরিক পরিশ্রম, অন্যদিকে আর্থিক বন্দিত্ব, শ্রমিকদের জীবন ছিল সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণাধীন।
গবেষকরা এটিকে ঔপনিবেশিক যুগের ‘company scrip’ ব্যবস্থার উদাহরণ হিসেবে দেখেছেন। ড. সুশীল চৌধুরী ও ড. সঞ্জীব বড়ুয়া উল্লেখ করেছেন টি-টোকেন শ্রমিকদের স্বাধীনতা কেড়ে নেয়নি, বরং তাদের কয়েক প্রজন্মকে দারিদ্র্য ও নির্ভরতার চক্রে আবদ্ধ রেখেছিল।
টি-টোকেন প্রধানত সিলেট ও কাছাড় অঞ্চলের চা বাগানগুলোতে ব্যবহৃত হতো। অন্যান্য অঞ্চলে যেমন দার্জিলিং বা আসামে এর ব্যবহার সীমিত ছিল। সর্বশেষ টোকেন অর্ডার হয়েছিল ১৯৩০-এর দশকে। ধীরে ধীরে দেশীয় মুদ্রার প্রাপ্যতা বাড়লে এই প্রথা ১৯৫০-এর দশকে সম্পূর্ণ বাতিল হয়।
আজ টোকেন আর ব্যবহার হয় না। তবে মিউজিয়াম, সংগ্রাহকদের কাছে এবং কিছু পুরনো বাগানের অফিসে এগুলো রয়ে গেছে ইতিহাসের সাক্ষ্য হিসেবে। টি-টোকেন কেবল প্রাচীন মুদ্রা নয় বরং শ্রমিক জীবনের নীরব কান্না, শোষণ ও ঔপনিবেশিক অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণের প্রতীক।
সবুজ চা-বাগানের সৌন্দর্যের আড়ালে লুকানো শ্রমিকদের ঘাম, রক্ত ও অশ্রু এই টোকেনের মধ্যে লিপ্ত। টি-টোকেন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, চা শুধু রঙ বা ঘ্রাণের পানীয় নয়, এটি ইতিহাসের রক্তে লেখা এক অধ্যায়।




















